বিডি নিউজ ৬৪: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় ২৫তম সম্মেলনের জন্য যোগ্য প্রার্থীর সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সভাপতি-সম্পাদক পদের জন্য ৭০ জন জীবনবৃত্তান্ত জমা দিলেও পরিচ্ছন্ন ও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী হাতেগোনা বলে সংগঠন সূত্রে জানা গেছে।
ফলে শিবির অধ্যুষিত ক্যাম্পাসটিতে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে—এ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলনে মিজানুর রহমান রানাকে সভাপতি ও এস এম তৌহিদ আল হোসেন তুহিনকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীকে মারধরের ঘটনায় ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট তুহিনকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি রানাকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জু ও খালিদ হাসান বিপ্লব। মেয়াদোত্তীর্ণ এই কমিটির অধিকাংশ নেতা ক্যাম্পাস ত্যাগ করায় কয়েক মাস ধরে সংগঠনটির সম্মেলনের দাবি ওঠে। তবে যোগ্য প্রার্থীর স্বল্পতায় বরাবরের মতো আসন্ন কমিটিও ‘প্রগতিশীল ক্যাম্পাস’ প্রতিষ্ঠায় কার্যত ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করছেন না ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদধারী কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এ আশঙ্কার আভাস মিলেছে।
ছাত্রলীগের ওই নেতারা বলছেন, নব্বই দশকের শেষ দিক থেকে ক্যাম্পাসটিতে শিবির যেভাবে আধিপাত্য বিস্তার করেছে, তা মোকাবেলায় সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের বিকল্প নেই। অথচ মহাজোট সরকার গঠনের পর ২০১০ সাল থেকে ছাত্রলীগের তিনটি কমিটির আমলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। এবারের সম্মেলনেও প্রার্থীদের মাঝে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড না থাকায় অনুপ্রবেশের ঘটনাও আগের চেয়ে ব্যাপক হারে বাড়ছে বলে তাঁরা মনে করেন। তাছাড়া বর্তমানে ছাত্রী হলগুলোতে কমিটি না হওয়ার সুযোগে ছাত্রী সংস্থার কার্যক্রম লাগামহীন আকার ধারণ করেছে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আব্দুল মজিদ অন্তর কালের কণ্ঠকে বলেন, “সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে ছাত্রলীগে প্রথমত মেধাবী ও প্রগতিশীল নেতৃত্ব চাই। দ্বিতীয়ত, ছাত্রলীগে কিছু মৌলবাদী অনুপ্রবেশের মাধ্যমে জাতির জনকের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করে যাচ্ছে- এদের প্রতিরোধ করা দরকার। ” তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হত্যা ও সম্প্রতি শিক্ষকদের চেম্বারে হিযবুত তাহরীরের প্রচারপত্রের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “ক্যাম্পাসে অনেক আগে থেকেই মৌলবাদী শক্তি সক্রিয়। ছাত্রলীগে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের যথেষ্ট অভাব রয়েছে, ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে উগ্রবাদ বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন হিসেবে তাঁরা অনুষ্ঠান করলে আমরা সহযোগিতা করব। ” নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উগ্রপন্থা নির্মূল করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা আছে, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক দিক-নির্দেশনার আলোকে স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের লক্ষ্যে সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনীর আদর্শভিত্তিক একটি সংগঠন গড়ে তোলা ও আদর্শিক পরিচর্যা অব্যাহত রাখা। দীর্ঘ সময়ের শিক্ষার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে একটি সহজলভ্য, বৈজ্ঞানিক, গণমুখী, বৃত্তিমূলক, কারিগরি, মাতৃভাষাভিত্তিক সর্বজনীন শিক্ষানীতি প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া। ” তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধকর্মের অভিযোগ রয়েছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, যৌন হয়রানি, মাদক সেবন, হলে সিট বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত ছাত্রলীগের এক শ্রেণির নেতাকর্মী। সংগঠনের কয়েকজন নেতা বলেন, “যথাযথভাবে সংগঠনের আদর্শ চর্চা না হওয়ায় একধরনের সুবিধাবাদী শিক্ষার্থী সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। ” এক্ষেত্রে তাঁরা বঙ্গবন্ধুসহ বিভিন্ন লেখকের বই নিয়ে পাঠচক্র করার মত দিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করলে কেউ অপরাধকর্মে লিপ্ত হবে না। উল্টো সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংগঠনে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। ”
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ২৭ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থী শপথবাক্যে স্বাক্ষর করে ছাত্রলীগের প্রাথমিক সদস্য হতে পারবে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে নবায়ন করার আবশ্যকতা থাকলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় এ ধরনের কার্যক্রম দেখা যায়নি। সংগঠনটির নেতা হতে পদপ্রত্যাশীকে নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং বয়সসীমা ২৯ বছর পর্যন্ত শর্ত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বিবাহিত, ব্যবসায়ী এবং চাকুরেদের নেতা হওয়ার সুযোগ নেই। এসব শর্তের সঙ্গে ছাত্রলীগের চেতনাধারণ ও নেতৃত্বগুণ দেখে নেতা নির্বাচন করা হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে অস্থিতিশীল পরিবেশে ক্যাম্পাসের হলে থেকে মাত্র ১৫-২০ জন নেতা মাঠে সক্রিয় ছিলেন। তখন জামায়াত-শিবিরের হামলার ভয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যান বেশিরভাগ নেতা। সেসময় অনেকের বিরুদ্ধে শিবির ও ছাত্রদলের সঙ্গে আঁতাতেরও অভিযোগ ওঠে। তবে তিন বছরের মাথায় এখন ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদের জন্য অন্তত ৭০ জন জীবনবৃত্তান্ত দিয়েছেন। এঁদের অধিকাংশই ‘বসন্তের কোকিল’ বলে ক্যাম্পাসে চাউর। শিবিরের হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। গত ২০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিপু হত্যার ঘটনায় দুই-তিনজন সন্দেহভাজনও প্রার্থী হয়েছেন বলে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে। তারপরও অনেকের ‘আশা জাগানিয়া’ এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কয়েকজন প্রার্থী জোরালো আলোচনায় রয়েছেন। এঁরা হলেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রাঞ্জু, সহসভাপতি মেহেদী হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া, সাহানুর ইসলাম শাকিল, সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু, সদস্য সাকিবুল হাসান বাকি এবং বঙ্গবন্ধু হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মিনারুল ইসলাম। তবে এঁদের অধিকাংশেরই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নেতা হওয়ার সব শর্ত নেই বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেদ হাসান বিপস্নব জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাবাস বাংলাদেশ’ মাঠে অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, বিশেষ অতিথি থাকবেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডুসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। সম্মেলন উদ্বোধন করবেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও প্রধান বক্তা হিসেবে থাকবেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন। সার্বিক বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, “জীবনবৃত্তান্ত জমাদানকারীদের মধ্যে যাদের যোগ্যতা নিয়ে সমস্যা নেই, তাদের মধ্য থেকে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হবে। ” যোগ্য প্রার্থী সঙ্কট আছে মনে করেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আপাতত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থীকে খোঁজা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটির সময় অন্য প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। ”
bdnews64 বাংলাভাষায় প্রকাশিত দেশের সর্ববৃহৎ সংবাদ পোর্টাল