সৌদি আরবের এক মা ইসলামি আইনের পুনঃব্যাখ্যা দাবি করলেন
সৌদি আরবের এক মা ইসলামি আইনের পুনঃব্যাখ্যা দাবি করলেন

সৌদি আরবের এক মা ইসলামি আইনের পুনঃব্যাখ্যা দাবি করলেন

বিডি নিউজ ৬৪: যখন সৌয়াদ আল-শামারি সৌদি ধর্মতাত্বিকদের ভারী ও লম্বা দাঁড়ি রাখার ব্যাপারে টুইটারে সিরিজ টুইট পোস্ট করেছিলেন তখন তিনি ভাবতে পারেননি যে তাকে এজন্য জেলে যেতে হবে।
তিনি মুখ ভর্তি ভারী দাঁড়িওয়ালা বেশ কয়েকজন মানুষের ছবি পোস্ট করেন- একজন গোঁড়া ইহুদি, একজন মাদকসেবী, একজন কমিউনিস্ট, একজন অটোমান খলিফা, একজন শিখ, এবং একজন মুসলিমের ছবি পোস্ট করেন তিনি। এরপর তিনি লিখেন, শুধু দাঁড়ি রাখলেই কেউ পবিত্র মানুষ বা মুসলিম হয়ে যান না। এবং এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর সময় ইসলামের এক ঘোর সমালোচকের দাঁড়ি মোহাম্মদ (সা.) এর চেয়েও বড় ছিল।
দুইবার বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটানো ইসলামি আইনের স্নাতক এবং ছয় সন্তানের এই মা হরহামেশাই এ ধরনের খোলামেলা মন্তব্য করেন। বর্তমানে ৪২ বছর বয়সী মিস. আল শাম্মারি একটি বড় গোত্রে ধর্মপ্রাণ মেয়ে হিসেবে বেড়ে উঠেছেন এবং ছোটবেলায় ভেড়া পালতেন। আর এখন তিনি তার উদার নারীবাদী ধ্যান-ধারণা ও বিতর্কগুলো ইসলামের মধ্য থেকেই তুলে ধরছেন। ফলে সৌদি আরবের ক্ষমতাশালী ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ তার ওপার বেজায় চটেছে।
নিজের মতামতগুলোর জন্য তাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। জনমতের বিরুদ্ধাচরণ করার দায়ে তাকে কোনো চার্জ গঠন ছাড়াই তিন মাস জেলে কাটাতে হয়েছে। সৌদি সরকার তার বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। তার অনলাইন ফোরাম ফ্রি সৌদি লিবারেলস নেটওয়ার্ক এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্লগার রাফি বাদাবি এখন ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাকে গণসম্মুখে অন্তত ৫০ বার চাবুক মারা হয়েছিল। তারা বাবা তাকে প্রকাশ্যে ত্যাজ্য করেছেন।
তবে মিস. আল শাম্মারি বলেন, “আমার এই অধিকার রয়েছে যে, আমাকে যেন এভাবে দেখা না হয় যে আমি আমার ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলছি। আমি এই অধিকারগুলো পেতে চাই। এবং আমি চাই যারা সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করেন তারা যেন আমার কথা শোনেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করেন।”
পুরো আরব বিশ্বজুড়েই নারী ইসলামি পণ্ডিত এবং অ্যাকটিভিস্টরা ইসলামি শরীয়ার পুনঃব্যাখ্যা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন যেখানে আল্লাহর সামনে নারী-পুরুষকে সমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মিস আল শাম্মারি সৌদি আরবের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ এবং উচ্চ পর্যায়ের ধর্মীয় ও নারী অধিকার কর্মী বা অ্যাকটিভিস্টদের একজন।
“তিনি যা বলেন তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত”
শাহার নাসিয়েফ নামে তার এক বন্ধু ও সহ-অ্যাকটিভিস্ট বলেন, “তিনি যা বলেন সে ব্যাপারে তিনি নিজে নিশ্চিত হয়েই বলেন এবং এতে তিনি কোনো ইতস্তত করেন না। তিনি আক্ষরিক অর্থেই এক বেদুইন পরিবেশ ও এক মরুভুমি থেকে এসেছেন। তিনি নিজের ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যাপারে খুবই গর্বিত। কিন্তু এর ফলে তিনি সকলের সঙ্গেই কিছুটা স্পষ্টবাদী হয়ে উঠেছেন। আর তিনি যা বলেন সে ব্যাপারে তিনি খুবই স্পষ্টবাদী হন।”

মিস. আল-শাম্মারি ভূ-ভাগবেষ্টিত প্রদেশ হাইল এর এক কৃষক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। পরিবারের ১২ সন্তানের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় তিনি পরিবারটির ভেড়ার পালের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি শুধু ধার্মিকই ছিলেন না বরং সালাফি মতবাদ লালন ও চর্চা করতেন। সালাফিরা হলেন এমন মুসলিম যারা ইসলামি আইনের আক্ষরিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করেন এবং সে অনুযায়ী ধর্মচর্চাও করেন।
তিনি হাইল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক করে সরকারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে নিজ গোত্রের এক পুরুষের সঙ্গে তার বিয়ে হয় যিনি তার চেয়ে দ্বিগুন বয়সী ছিলেন। প্রথম সংসারে ইয়ারা নামে তার একটি মেয়ে সন্তান হয়। এরপর মাত্র ২০ বছর বয়সে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটান। এবার হাইলের প্রধান বিচারকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। যিনি তার বিয়ে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়ার দেখভাল করেছিলেন।
তার মেয়েকে যেদিন তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় সেদিন থেকেই তিনি নারী অধিকার আন্দোলন শুরু করেন। তার মেয়ে ইয়ারার বয়স যখন সাত বছর হয় তখন তার সাবেক স্বামী ও ইয়ারার বাবা ইয়ারাকে নিয়ে যায়। আর আল শাম্মারি যেহেতু পুনরায় বিয়ে করেন সে কারণেই আদালত রায় দেন যে, মেয়েটিকে রক্ত সম্পর্ক বহির্ভুত অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে একঘরে না রেখে বরং তার নিজ বাবার সঙ্গেই রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *