সরকারের জরুরি প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা

বিডি নিউজ ৬৪: কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের দুই পাশে ১০০ ফুট খাল খনন করছে রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)। এ জন্য প্রায় ৩০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করছে রাজউকের একটি চক্র। ভূমি অধিগ্রহণ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের মনগড়া সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভূমি মালিকদের ওপর। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বর্তমান বাজার দরের চেয়ে ১০ গুণ কম ক্ষতিপূরণ পাবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

২২ আগস্ট অনুষ্ঠিত এক যৌথসভায় ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ১৫ বছর আগে সম্পন্ন হওয়া সিটি জরিপ অনুযায়ী জমির শ্রেণি নির্ধারণ করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সে সভায়। তখন সেখানকার অধিকাংশ জমি ছিল ‘নাল’ কিংবা ‘বোরো’ শ্রেণির। কিন্তু বর্তমানে সে সব জমি ভরাট করে প্লট আকারে বহুতল কিংবা হাইরাইজ ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। বাড়ি মালিকরা সেখানে অসংখ্য গাছপালা লাগিয়েছেন। এর মধ্যে কিছু জমি ভরাট করে অনেকে বাড়ি নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ বা প্লট বিক্রি করে দিয়েছেন। অথচ এসব জমিকে একটি চক্র নিচু পানি কিংবা নাল জমি দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করছেন।

জোয়ার সাহারার আব্দুল বাতেন বলেন, এলাকাবাসীকে এ পর্যন্ত সাতবার জমি অধিগ্রহণের নির্মম শিকার হতে হয়েছে। বৃটিশ আমলে রেললাইন, ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা ময়মনসিংহ সড়ক, পাকিস্তান আমলে বিমানবন্দর, নিকুঞ্জ, বাংলাদেশ আমলে পূর্বাচল, ৩০০ ফুট রাস্তা নির্মাণের নামে আমাদেরকে সর্বস্বান্ত এবং বাস্তুহারা করা হয়েছে। সর্বশেষ খাল খননের নামে আমাদের শেষ সম্বল কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ প্রদান নিয়ে চলছে নানা টালবাহানা। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী জমির মূল্য পেলে হয়ত ছেলেমেয়ে নিয়ে শেষ জীবনটা কাটাতে পারবো। তা না হলে পথে বসা ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি থাকবে না।

খাল খনন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, আগের জরিপ অনুযায়ী জমির শ্রেণি ধরে ক্ষতিপূরণের কোনো বিধান ভূমি অধিগ্রহণ আইনে নেই। কিভাবে রাজউকের সভায় সিটি জরিপ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত হলো সেটা আমার বোধগম্য নয়। যদি তাই হয়, তাহলে যৌথ জরিপের প্রয়োজন নেই। সিটি জরিপের পর্চা বই দেখেই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে যেহেতু সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নির্ধারণ হয়ে থাকে, সে জন্য সিটি জরিপের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেটা করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করলে পুরো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।

ঢাকা জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে খাল খননের অনুমোদন পাওয়ার পর একটি যৌথ কমিটি সরেজমিনে তদন্তপূর্বক ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের কাজ শুরু করা হয়। উক্ত কমিটিতে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা ছাড়াও প্রত্যাশী সংস্থার প্রতিনিধি থাকেন। তারা যৌথভাবে জমির শ্রেণি, জমির ওপর স্থাপনা, গাছপালাসহ অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেন। এর স্বচ্ছতার জন্য অধিগ্রহণকৃত এলাকার ভিডিও চিত্র ধারন করা হয়। এর বাইরে আর কোন প্রক্রিয়ায় অধিগ্রহনকৃত জমির ক্ষতিপূরণ প্রদানের আর কোনো সুযোগ নেই।

ভূমি অধিগ্রহণ ম্যানুয়েলে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে, অধিগ্রহণকৃত যে জমির ওপর গাছপালা থাকে সেগুলোকে উচু জমি হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। এসব জমির শ্রেণি হয়ে থাকে ভিটি বা বাগান। বর্তমানে খালের জন্য যেসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে সেখানে গাছের আধিক্য রয়েছে। তাই অতীতের জরিপ ধরে জমির শ্রেণি নির্ণয় করা হলে বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না।

অধিগ্রহণ আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ এভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে জমির মালিকরা কোনোভাবেই ক্ষতির শিকার না হন।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রত্যাশী সংস্থার কথামতো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো বিধান নেই। বাস্তবে জমির অবস্থান এবং স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হিসাবে করেও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ হয়ে থাকে। এ জন্য সরেজমিনে ভূমি এবং স্থাপনার অবস্থান দেখার বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি নির্ধারণ জন্য সেখানকার জমির রেজিস্ট্রিকৃত একবছরের দলিল পরীক্ষা-নিরীক্ষারও সুযোগ রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় কর্মরত একাধিক কানুনগো ও সার্ভেয়ার জানান, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দিষ্ট আইন-কানুন রয়েছে। রাজউক ইচ্ছা করলেই ভূমি মালিকদেরকে জমির মূল্য কম দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে পারবেন না। কারণ শুধু ৩০০ ফুটের দুই পাশে খালের জন্যই জমি অধিগ্রহণ হয়নি, দেশের আরো অনেক উন্নয়নমূলক কাজে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। যেমন উক্ত খাল প্রকল্পের অদূরে মাদানী এভিনিউ করার সময় যে জমির অধিগ্রহণ করা হয়েছিল সেখানে বর্তমান সময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাস্তব অবস্থা দেখে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় ক্ষতিগ্রন্তদের। সেখানে তো সিটি জরিপ অনুযায়ী জমির শ্রেণি বিভাগ করা হয়নি। আর সেটা করা হলে তা কেউ মানবেও না। এ ক্ষেত্রে বেআইনি কিছু করা হলে রাজউকের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা সৃষ্টি হবে।

রাজউক চেয়ারম্যান এম বজলুল করিম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, কিভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা দিলে ভালো হবে সে জন্য আমরা কিছুদিনের মধ্যেই গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি সভা করার চিন্তা-ভাবনা করছি। বর্তমান জমির অবস্থার ওপর নির্ভর করে কি জমির শ্রেণিবিভাগ করা হবে, না সিটি জরিপ অনুযায়ী করা হবে সেটা নির্ভর করবে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা আরো ক্ষতির শিকার হবেন এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *