দেশে গত এক বছরে গবাদিপশুর (গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়া) সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার। মাংসের মূল্যবৃদ্ধি, ৫ শতাংশ সুদে গবাদিপশু পালনে ঋণের সুবিধা এবং বিক্রির নিশ্চয়তা—এসব কারণে গবাদিপশু পালন বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।
খামারি, চামড়া ও মাংস ব্যবসায়ী সমিতি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, গবাদিপশু পালন বৃদ্ধি পাওয়ায় আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য গরু আছে ৪৪ লাখ ২০ হাজার। ছাগল-ভেড়া রয়েছে ৭০ লাখ ৫০ হাজার। এ ছাড়া কাগজে-কলমে রপ্তানি বন্ধ থাকলেও ভারত থেকে অনেক গরু আসছে। মিয়ানমার থেকেও গরু আসছে। ফলে এবার কোরবানির জন্য পশুর সংকট হবে না। কারণ, প্রতিবছর কোরবানিতে জবাই হয় ৫০ থেকে ৫৫ লাখ গরু।
বাংলাদেশ চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি, মাংস ব্যবসায়ী সমিতি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে প্রতিবছর কোরবানির ঈদে ৫০ থেকে ৫৫ লাখ গরু জবাই হয়। এর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সরবরাহ করতেন দেশের খামারিরা। বাকি গরু ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসত। গত বছর ভারত থেকে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশে গরুর দাম কিছুটা বাড়লেও তেমন সংকট হয়নি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর ভারত থেকে খুব অল্প গরু এসেছে। ফলে আমরা দেশি গরু দিয়েই কোরবানির চাহিদা মিটিয়েছি। আশা করি, এ বছরও গরু নিয়ে কোনো সংকট হবে না।’
গরু ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে গত বছরের শুরুতে হঠাৎ করে বাংলাদেশে গরু রপ্তানি বন্ধ করা হয়। গরু চোরাচালান রোধে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও গরু আসার করিডরগুলোতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কঠোর নজরদারি করে। ফলে ভারত থেকে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আগে যেখানে কোরবানির আগে ভারত থেকে ২০-২৫ লাখ গরু আসত, সেখানে গত বছর তা কমে দাঁড়ায় আড়াই লাখে।
ভারতীয় গরু আসা বন্ধের প্রভাবে দেশে গরুর মাংসের দাম বেড়ে যায়। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক বছরে বাজারে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১৮ শতাংশ। এর আগের বছর বেড়েছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে গো-খামারিদের লাভের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া ভারতীয় গরু কম আসায় গরু বিক্রির নিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে গরু লালন-পালন বেড়ে যায়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, আগে দেশে সাধারণত প্রতিবছর গবাদিপশুর সংখ্যা দুই থেকে তিন লাখ করে বাড়ত। কিন্তু গত এক বছরে বেড়েছে ৫ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে গরু প্রায় দেড় লাখ। এর আগের বছর গবাদিপশু বেড়েছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে গরু ছিল ৮০ হাজার। এ বছর গবাদিপশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ২০০ কোটি টাকার একটি পূর্ণচক্রায়ণ তহবিল তৈরি করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে খামারিদের ৫ শতাংশ সুদে মোট ৬৫ কোটি টাকার গবাদিপশু ঋণ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, কম সুদে ঋণ গবাদিপশু লালন-পালনের পরিমাণ বাড়িয়েছে। এর ফলে বেড়েছে গরুসহ গবাদিপশুর সংখ্যা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে মোট গবাদিপশুর সংখ্যা ৪ কোটি ৯০ লাখ। এর মধ্যে গরু-মহিষ ২ কোটি ৩৫ লাখ এবং ছাগল-ভেড়া ২ কোটি ৫৫ লাখ।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সূত্র বলেছে, আগে গবাদিপশুর ৭০ শতাংশই আসত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে। বাকি ৩০ শতাংশ আসত অন্যান্য এলাকা থেকে। গত দুই বছরে এসব অঞ্চলের পাশাপাশি টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী ও মানিকগঞ্জের মতো জেলায়ও গবাদিপশু পালন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর ফলে দেশি গরুর সরবরাহও বেড়েছে।
পাশাপাশি গত এক বছরে ভারত থেকে গরু আসাও বেড়েছে। ভারত থেকে গরু আসে এমন ৩২টি সীমান্ত করিডরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিনই গরু আসছে। কোরবানি যত এগিয়ে আসছে, গরু আসার সংখ্যাও বাড়ছে। অনেক ক্ষুদ্র খামারির আশঙ্কা, ভারতীয় গরু আসার পরিমাণ অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে দেশি গরুর দাম কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, ‘ভারতীয় গরু কম আসায় আমরা দেশি গরুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। দেশি গরুর মাংসের দাম বেশি হলেও মাংসের মানও ভালো।’ কোরবানির আগে ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গরুর দাম স্থিতিশীল আছে বলে তিনি জানান।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর কোরবানির ঈদ উপলক্ষে গরু-ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে ১ কোটি ৯ লাখ পশু প্রস্তুত ছিল। এর মধ্যে কোরবানি দেওয়া হয়েছে ৯৬ লাখ গরু-মহিষ, ছাগল ও ভেড়া। অর্থাৎ গতবারও কোরবানির পশুর সংকট হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর রাজশাহীর আটটি করিডর দিয়ে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় গরু এসেছে। একসময় সবচেয়ে বেশি গরু আসত সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গার করিডর দিয়ে। তবে দুই বছর ধরে এ দুটি জেলার করিডর দিয়ে অল্প গরু আসছে।
রাজশাহী বিভাগীয় কাস্টমস ও এক্সাইজ কার্যালয় সূত্র বলেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজশাহী বিভাগের করিডরগুলো দিয়ে ভারত থেকে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৭৯টি গরু ও মহিষ আসে। এর মধ্যে গরু ১ লাখ ৩২ হাজার। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪৭টি গরু-মহিষ এসেছে।
খুলনা অফিস জানিয়েছে, সাতক্ষীরার চারটি করিডর দিয়ে কয়েক বছর আগেও কোরবানির ঈদের আগে কয়েক লাখ গরু আসত। কিন্তু গত বছর গরু আসার পরিমাণ অনেক কমে যায়। গত বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত ভারত থেকে প্রায় আট হাজার গরু আসে। এ বছর একই সময়ে গরু এসেছে প্রায় ১৪ হাজার। তবে খুলনা কাস্টমস ও এক্সাইজ সূত্র বলেছে, এ এলাকা দিয়েও ভারত থেকে গরু আসা বাড়ছে।
পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি জানান, পাটগ্রাম কাস্টমস অফিসের ইসলামপুর শুল্ক করিডর দিয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১২ হাজার ৫৫৮টি গরু এসেছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার গরু এসেছে।
ইসলামপুর শুল্ক করিডরের কাস্টমস অফিসের সূত্রমতে, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর গরু ব্যবসায়ীরা গরু আনার জন্য ইসলামপুর শুল্ক করিডর ব্যবহার করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চারজন গরু ব্যবসায়ী বলেন, সীমান্তে কাঁটাতারের ওপারে বিএসএফের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও এবার গরু আসা বাড়ছে।
bdnews64 বাংলাভাষায় প্রকাশিত দেশের সর্ববৃহৎ সংবাদ পোর্টাল