বিডি নিউজ ৬৪: মৃত ব্যক্তিদের নামে বয়স্ক, বিধবা ও পঙ্গুভাতার অর্থ উত্তোলন করে ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও ব্যাংক কর্মকর্তা মিলে আত্মসাৎ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় ৫ বছর যাবত জেলার মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল ইউপির চেয়ারম্যান, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তার যোগশাজসে নামে-বেনামে ভুয়া এবং মৃত ব্যক্তিদের নামে বয়স্কভাতা ও বিধবা ভাতার অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করার তথ্য পাওয়া গেছে। মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য স্থানীয় চৌকিদার শিপারুল হক ভুঁইয়ার টিপসইয়ে ১৬০ জনের নামে বিধবা, বয়স্ক ও পঙ্গুভাতা উত্তোলন করে অল্পসংখ্যক লোককে কিছু টাকা দিয়ে পুরো টাকাই ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ চক্রটি।
জানা যায়, উপজেলার শ্রীকাইল ইউপির চেয়ারম্যান আবুল হাসেম বেগের যোগসাজশে ওই ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফরিদ উদ্দিন ভুতাইল, সাহগোদা ও মনোহরাবাদ গ্রামের ১৬০ জন হতদরিদ্র লোকের নামে বয়স্ক, বিধবা ও পঙ্গুভাতার কার্ড তৈরি করে নিজের কাছে সংরক্ষণ করে নিয়মিত অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করে আসছিলেন। সরকারি বিধি অনুসারে এসব ভাতার সুবিধাভোগীরা নিজেরাই তাদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করার কথা। কিন্তু ওই ইউনিয়নে ঘটেছে এর উল্টো চিত্র। স্থানীয় ইউপি সদস্য ফরিদ উদ্দিন সুবিধাভোগী ১৬০ জন দু:স্থ ব্যক্তির ভাতার কার্ড কৌশলে নিজের কাছে আটকে রেখে প্রতি বছর ২ কিস্তিতে প্রায় ৯ লাখ টাকা উত্তোলন করে অধিকাংশ টাকাই আত্মসাৎ করেন। বিগত ৫ বছর যাবত এসব অসহায় লোকদের কার্ড নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে ব্যাংক কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদের যোগশাজশে চৌকিদার শিপারুল হক ভূঁইয়ার টিপসইয়ে এসব ভাতার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন ওই চক্রটি। ওই ১৬০ জনের মধ্যে ভুতাইল গ্রামের নসু সরকার, আনছর আলী, আনোয়ারা বেগম, আছিয়া খাতুন, আব্দুল মান্নান, ফরিদ মিয়া, রুজিনা খাতুন, ইদন মিয়া, জুলেখা খাতুন, মজিদ মিয়া, ফুলেছা বেগম, জোবেদা খাতুন, সাহেরা খাতুন, হাফেজা খাতুন, সাফিয়া খাতুন, সুখিলা বেগম, আব্দুল বারিক, বাবর আলীসহ অর্ধশতাধিক ভাতাভোগী বেশ কয়েক বছর আগে মারা গেলেও ওই মৃত ব্যক্তিদের নামে ভুয়া টিপসই দিয়ে সরকারী এ অর্থ উত্তোলন করে ফরিদ মেম্বার গংরা ।
স্থানীয়রা জানায়, ইউপি সদস্য ফরিদ উদ্দিন তার মা জোহরা খাতুন ও পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যসহ আশপাশে নামে-বেনামে আরও বেশ কিছু লোকের নামে বিধবা ভাতা ও বয়স্ক ভাতার কার্ড তৈরি করে সকল অর্থ নিজেই আত্মসাৎ করে যাচ্ছেন।
ভুয়া টিপসই দেওয়ার বিষয়ে চৌকিদার শিপারুলের কাছে জানতে চাইলে নিজের এ অপকর্মের কথা স্বীকার করে তিনি জানান, ফরিদ মেম্বারের নির্দেশে আমি টিপসই গুলো দিয়েছে।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বশির আহাম্মদ জানান, বেশ কয়েক বছর যাবত ইউপি সদস্য ফরিদ উদ্দিন আমাদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অসহায় গরীবদের ভাতার কার্ড আটকে রেখে অর্থ আত্মসাৎ করছে- এমন অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিনই ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে আসছে। তিনি আরো জানান, আমরা সমাজের লোকজন মিলে দু:স্থদের এসব ভাতার টাকা পরিশোধের জন্য চাপ প্রয়োগ করেছি কিন্তু সে আমাদের কথা তোয়াক্কা না করে আত্মসাৎ অব্যাহত রেখেছে।
ভুতাইল গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, বিষয়টি জানতে পেরে আমরা ফরিদ মেম্বারকে গরীবদের ভাতার কার্ড গুলো ফেরৎ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম কিন্তু সে আমাদের কথা শুনেনি। বয়স্ক ও বিধবা ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী একজন ইউপি সদস্য তার ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী ব্যক্তি শনাক্ত করে কমিটির সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে প্রস্তাব পাঠাবে। চেয়ারম্যান তা যাচাই-বাছাই করে কার্ডে স্বাক্ষর করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ব্যাংকে একাউন্ট করে নিজ স্বাক্ষর ও টিপসহির মাধ্যমে ভাতার অর্থ উত্তোলন করবে। শ্রীকাইল ইউপির ক্ষেত্রে এসব কোন নিয়ম নীতিকে তোয়াক্কা না করে ভাতার টাকা পকেটস্থ করেছিল ওই চক্রটি।
শ্রীকইল ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভুতাইল গ্রামের কবির মিয়া জানান, তার মা আছিয়া খাতুন ২ বছর ৭ মাস আগে মৃত্যুবরণ করলেও তার মায়ের বিধবা ভাতার কার্ডটি সচল রেখে ইউপি চেয়ারম্যান ও ফরিদ মেম্বার নিয়মিত অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে তা আত্মসাৎ করে। একই গ্রামের কমল সরকার অভিযোগ করে বলেন, আমার নানা নসু সরকার ৩ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করলেও তার বয়স্ক ভাতার কার্ডটি দিয়ে চেয়ারম্যান হাশেম বেগ ও ফরিদ মেম্বার মিলে ভুয়া টিপসই দিয়ে অর্থ উত্তোলন করে নিয়মিত আত্মসাৎ করে আসছে।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান আবুল হাশেমের যোগসাজশ ছাড়া ভাতার অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব নয়। তিনি এ সকল কাজে ইউপি সদস্য ফরিদ উদ্দিনকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সব কিছু জেনে শুনেও মৃত ব্যক্তিদের কার্ডে সভাপতি হিসেবে স্বাক্ষর করেন ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাশেম বেগ।
তবে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাশেম বেগ বলেন, আমি সভাপতি হিসেবে কার্ডে স্বাক্ষর করেছি মাত্র। বয়স্ক ও বিধবা ভাতা আত্মসাতের সকল দায়ভার অভিযুক্ত ইউপি সদস্য ফরিদ উদ্দিনের।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ফরিদ উদ্দিন বলেন, আমি যাদের কার্ড আটকে রেখে টাকা উত্তোলন করেছিলাম বেশীর ভাগ লোকের অর্থই পরিশোধ করে ফেলেছি। তিনি আরো বলেন, পর্যায়ক্রমে অন্যদের টাকাও আমি পরিশোধ করে দেব।
মৃত ব্যক্তিদের নামে প্রতারণা করে অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব কার্ড আমি পরিবর্তন করে অন্যদের নামে করে দেব।
এ ব্যাপারে উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আবু তাহের বলেন, মৃত ব্যক্তিদের নামে ভাতা উত্তোলন করে আত্মসাতের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। তবে এ বিষয়ে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
bdnews64 বাংলাভাষায় প্রকাশিত দেশের সর্ববৃহৎ সংবাদ পোর্টাল