শাহজালালে তিন লাখ টাকা জরিমানা গুনল ইত্তেহাদ

বিডি নিউজ ৬৪: ওভারবুক্ড প্যাসেঞ্জারদেরকে প্রাপ্য সুবিধা না দিয়ে মিসহ্যান্ডেল করার দায়ে ইত্তেহাদ এয়ারওয়েজকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তিনজন যাত্রীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে রবিবার সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে রাত ৯ টায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৫৩ ধারায় এ আদেশ দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসুফ।

অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন বাহরাইনগামী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রবিউল্যাহ ও রাসেল মিয়া এবং কুমিল্লার সুমন মিয়া। আদালত সূত্রে জানা যায়, এঁদের তিনজনই ইত্তেহাদ এয়ারওয়েজের গত পরশু রাত ৯.৪৫ টার ফ্লাইটের কনফার্মড প্যাসেঞ্জার ছিলেন। ঐ দিন যথারীতি চেক-ইন কাউন্টারে গেলে কাউন্টার থেকে সিস্টেমের তথ্য দেখে বলা হয় যে, তাঁদের বুকিং পরের দিন ভোর ৫.৪০ টায় গাল্ফ এয়ারের একটি ফ্লাইটে শিফ্ট করা হয়েছে। কিন্তু কেন শিফ্ট করা হয়েছে, কে করেছে- এসব বিষয়ে কোন তথ্য কাউনটারে ছিল না বা দিতে পারেনি। অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, তাঁদের সাথে মোট ৮ জন যাত্রীকে এভাবে ফেরত দেয়া হয়।

যাত্রীরা রাতভর অপেক্ষা করে ভোররাতে গাল্ফ এয়ারের কাউন্টারে গেলে সেখান থেকেও তাঁদেরকে ফেরত দেয়া হয় এবং জানিয়ে দেয়া হয় যে, সিস্টেমে এ ধরনের বুকিং শো করছে না। যাত্রিরা নিজনিজ ট্রাভেল এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করতে থাকে। ট্রাভেল এজেন্সিগুলো থেকে ইত্তেহাদের সাথে যোগাযোগ করে কোন ধরনের সদোত্তর না পেয়ে এক ট্রাভেল এজেন্সি বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেটদের ফেইসবুক পেইজ “ম্যাজিস্ট্রেটস, অল এয়ারপোর্টস অব বাংলাদেশ”-এ বিষয়টি জানিয়ে একটি ম্যাসেজ পাঠান।

গতকাল ম্যাসেজ পেয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসুফ তিনজন যাত্রীর সাথে যোগযোগ করতে সক্ষম হন এবং তাঁদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে রবিবার সন্ধ্যায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। যাত্রীদের অভিযোগ, সিস্টেমের তথ্য এবং ইত্তেহাদের স্থানীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে মোবাইল কোর্টে উদঘাটিত হয় যে, সিটের অতিরিক্ত বুক করা ৮ যাত্রিকে ইত্তেহাদের দুবাইস্থ কেন্দ্রীয় রিজার্ভেশন কন্ট্রোল থেকে গাল্ফ এয়ারের পরদিনের ফ্লাইটে রি-বুক করা হয়। কিন্তু বিষয়টি যাত্রী কিংবা ইত্তেহাদের লোকাল অফিসের কাউকে জানানো হয়নি। অন্যদিকে নতুন বুকিং তথ্য গাল্ফ এয়ারের সিস্টেমেও আপডেট হয়নি। এতে কোর্ট আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যে অনিয়মগুলো দেখেছেনঃ

পাঁচ শতাংশ ওভারবুকিং করার বিধান রয়েছে এবং ওভারবুক্ড প্যাসেঞ্জারদের তিন ধরনের ব্যবস্থাপনার মধ্যে অন্য এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে পাঠানোরও একটি বিধান রয়েছে। তবে তা অবশ্যই প্যাসেঞ্জারদের মতামতের ভিত্তিতে হতে হবে এবং প্যাসেঞ্জার অন্য এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে যেতে রাজী হলেই কেবল এ ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তীত ফ্লাইটের টিকেটের দাম কম হয়ে থাকলে, মুল টিকেট ও পরিবর্তীত টিকেটের দামের পার্থক্যের সমপরিমাণ অর্থ তাঁদের ফেরত দিতে হবে। পাশাপাশি তাঁদেরকে মূল এয়ারলাইন্স কর্তৃক নির্ধারিত ডিনাইড বোর্ডিং কমপেনসেশন বা ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। ইত্তেহাদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতিপূরণ যাত্রীপ্রতি ইকোনোমি ক্লাশে দু’শ মার্কিন ডলার (১৬ হাজার টাকার অধিক)।

কিন্তু বিবেচ্য ক্ষেত্রে অন্য এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে টিকেট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যাত্রিদের মতামতের তোয়াক্কা করা হয়নি। সেন্ট্রাল অফিস থেকে ইচ্ছেমত পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। এমনকি লোকাল অফিসকেও জানানো হয়নি। এতে করে লোকাল অফিস থেকে যাত্রীদের থাকা-খাওয়া, ক্ষতিপূরণ এবং পরিবর্তিত টিকেটের মুল্যঘাতটির অর্থ ফেরতসহ কোনও সুবিধা প্রদান করাও সম্ভব হয়নি। যাত্রিরা তাঁদের অধিকার এবং প্রাপ্য সেবা ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে গাল্ফ এয়ারের সিস্টেমে আপডেটজনিত ত্রুটির কারণেও যাত্রীরা পুনরায় হয়রানির শিকার হয়েছে। এ ধরনের শিফ্টিং এর ক্ষেত্রে সাধারণত ওভার কনফার্ম হতে হয় এবং একজন কর্মকর্তাকে সাথে দিয়ে যাত্রীদের চেক-ইন নিশ্চিত করতে হয়, যা ইত্তেহাদ করেনি।

মোবাইল কোর্টে উপস্থিত তিনজন যাত্রীর তিনটি পৃথক অভিযোগের প্রেক্ষিতে এয়ার কর্তৃপক্ষ দায়িত্বে অবহেলা এবং স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে প্রতিশ্রুত সেবা থেকে যাত্রিদের বঞ্চিত করে আর্থিক ক্ষতিসাধন ও মানসিক হয়রানির কারণ সৃষ্টি করায় ভোক্তা অধিকার আইনের ৫৩ ধারার অপরাধের জন্য প্রত্যেক অভিযোগের বিপরীতে এক লক্ষ টাকা করে মোট তিন লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেয়া হয় এবং একই আইনের ৭৬ ধারা অনুযায়ী জরিমানার ২৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তদের প্রদানের এবং ৭৫ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি নিয়মানুযায়ী যাত্রীদের প্রত্যেককে ডিনাইড বোর্ডিং কম্পেনশেসন বাবদ ২শ ডলার ভাউচার প্রদানপূর্বক যথারীতি ইত্তেহাদে করে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করারও আদেশ দেয়া হয়।

মোবাইল ফোনে ম্যাজিস্ট্রেট ইউসুফ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে যাত্রীদের গতকালকের ইত্তেহাদের ফ্লাইটে গন্তব্যে প্রেরণ করা হয়েছে। এয়ারলাইন্স কর্তৃক তাঁদের প্রত্যেককে ডিনাইড বোর্ডিং কমপেনসেশন বাবদ ২শ’ মার্কিন ডলার মূল্যমানের ভাউচারও প্রদান করা হয়েছে। তবে জরিমানার অর্থ আদায় হওয়ার আগেই ফ্লাইটের সময় হয়ে যাওয়ায় তাঁদের হাতে আদায়কৃত জরিমানার প্রাপ্য ২৫ শতাংশ দেয়া সম্ভব হয়নি। অর্থ প্রদানের জন্য যাত্রীদের পক্ষে দেশে অবস্থানরত তাঁদের প্রতিনিধির ফোন নম্বর এবং নাম-ঠিকানা রেখে যাত্রীদেরকে ফ্লাইটে তুলে দিতে হয়েছে। রাত ১০টার পর জরিমানার অর্থ আদায় হলে প্রতিনিধিদের খবর দেয়া হয়। যাত্রী রবিউল্যার পক্ষে তাঁর দূলাভাই রফিক সাহেব এসে ২৫ হাজার টাকা বুঝে নিয়েছেন। অন্য দু’জনের প্রতিনিধিকে খবর দেয়া হয়েছে। আশা করা যায়, তাঁরা আজ-কালের মধ্যে এসে প্রাপ্য অর্থ বুঝে নেবেন জানান ম্যাজিস্ট্রেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *