মাইকেল ফেলপসের বিদায়ী মুহূর্ত

বিডি নিউজ ৬৪: তিনি শুধু একজন সাঁতারু নন, একজন শিল্পী। তার শিল্প প্রস্ফুটিত হতো সুইমিং পুলের নীল জলে। তিনি মার্কিন ‘জলদানব’ মাইকেল ফেলপস। ৩১ বছর বয়সী এই ক্রীড়াবিদ পড়ন্ত বয়সে রিও অলিম্পিক থেকেই উজ্জল পারফর্মেন্সের মাধ্যমে এবার পাকাপাকিভাবে পুলকে বিদায় জানালেন। পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে একের পর এক রেকর্ড গড়ে যাওয়া পুল সম্রাট ফেলপস সর্বাধিক সংখ্যক ২৩টি অলিম্পিক সোনা জিতে নিয়েছেন। যার মধ্যে চলতি রিও অলিম্পিকেই পাঁচটি। সব মিলিয়ে ২৮টি অলিম্পিক পদকের মালিক তিনি। সিঙ্গাপুরের নবীন সাঁতারু জোসেফ স্কুলিং সেই হইচই ফেলে দেওয়া ‘আপসেট’-এর ঘটনা না ঘটালে হয়তো আরও একটি সোনা জমা পড়ত ফেলপসের ঝুলিতে। তাতে কী? ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে এসে ভবিষ্যতের ‘জলদানবের’ পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

আর কখনো তাকে পুলে ঝড় তুলতে দেখা যাবে না। তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে অবসান হতে যাচ্ছে একটি যুগের। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের এই বিরল প্রতিভার ক্যারিয়ার তো শেষ হয়েছিল আরও আগেই। ২০১২ সালে অবসর নেওয়ার একবছর পরই অবসর ভেঙ্গে পুলে ফেরেন তিনি।  অবসর গ্রহণের জন্য এর চাইতে ভাল সময় কি আর হয়? ফেলপসের কোচ বব বোম্যান তো বলেই দিলেন, “ফেলপস তার ক্যারিয়ারে যত অর্জন করেছে, আগামী দশ প্রজন্মেও সেই অর্জন কেউ করতে পারবে না।”

আর ফেলপস বললেন, “রিও অলিম্পিক আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় সময়।”

জলদানবের বিদায়বেলায় অলিম্পিকে অংশ নেওয়া প্রায় সকল মার্কিন ক্রীড়াবিদরা উপস্থিত ছিলেন। পাশে ছিলেন ফেলপসের মা, বাগদত্তা নিকোল জনসন এবং তাদের ভালবাসার উপহার তিন মাস বয়সী সন্তান বুমার। অবসরের পর ফেলপস এখন তার পরিবারকেই বেশি সময় দিতে চান। রিও অলিম্পিক শেষে দেশে ফিরেই বাগদত্তা নিকোলের সঙ্গে বিয়ের কাজটাও সেরে ফেলবেন। সন্তান যেন তার সহচর্যে বেড়ে উঠতে পারে সেটাই এখন ফেলপসের লক্ষ্য। হয়তো সন্তানকে ভবিষ্যতের ‘ফেলপস’ হিসেবে গড়ে তোলার তালিম দেওয়া শুরু করবেন এখন থেকেই।

অবসর ভাঙ্গার পরই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন ফেলপস। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর দায়ে ২০১৪ সালে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশীপে তাকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্ত এই ঘটনাই ফেলপসকে বদলে দেয়। তিনি মদ্যপান ছাড়েন। পরিবারে মন দেন। প্রেমিকা নিকোলের সঙ্গেও সম্পর্কে মনযোগী হন। পৃথিবীতে আসে তাদের ভালবাসার ফসল বুমার। কথা ছিল রিও অলিম্পিকের শেষে তারা বিয়ে করবেন। সেই রিওতে এলেন, দেখালেন এবং জয় করলেন। ফেলপসের ফাইনাল দেখতে আসা ১৯ বছর বয়সী মার্কিন সাঁতারু লেডেস্কি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেই ফেললেন, “মাইকেলের অলিম্পিক ফাইনালে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি গর্বিত। এটা আমার জীবনের সেরা দৃশ্যগুলোর অন্যতম।”

ব্যাকস্ট্রোকে সোনা জয়ী সাঁতারু মার্ফি বললেন, “আপনি কোন দেশের হয়ে পদক জয় করছেন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার দ্বারা ক্রীড়াবিশ্ব কী পাচ্ছে। মাইকেল ফেলপস এই জায়গাতেই শ্রেষ্ঠ। কারণ তার কাছে শুধু দেশ নয়; বরং ক্রীড়াবিশ্ব পেয়েছে অনেককিছু। এই অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারের এমন সুন্দর সমাপ্তিই সবার কাম্য।”

ফেলপস অলিম্পিক ইতিহাসের সবচেয়ে সফল এবং সেরা ক্রীড়াবিদ। তিনি পুলের অবিসংবাদিত সম্রাট। তার বিদায়টা আর দশজনের মতো সাধারণ হবে না। হওয়া উচিৎ নয়। শনিবার রাতে তাই অলিম্পিকের শেষ পদকটি গলায় ঝুলিয়ে ফেলপস এগিয়ে গেলেন গ্যালারিতে বসা তার মায়ের দিকে। মায়ের হাত থেকে নিজ দেশের পতাকা নিয়ে উড়িয়ে দিলেন। পুরো গ্যালারি তখন জলদানবের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত। ফেলপস পতাকাটি তুলে দিলেন তার তনয় বুমারের দিকে। তারপর শুন্যে দৃষ্টিপাত করে আনমনে বলে উঠলেন “থ্যাংক ইউ রিও।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *