ফেলপসকে হারানো জোসেফ স্কুলিং কে?

বিডি নিউজ ৬৪: রিও অলিম্পিকের সবচেয়ে বড় আপসেটের জন্ম দিয়েছেন তিনি। আমেরিকান ‘জলদানব’, অসংখ্য রেকর্ড যার ঝুলিতে সেই মাইকেল ফেলপসকে হারিয়ে সোনা জিতে নিয়েছেন সিঙ্গাপুরের এই ২১ বছর বয়সী তরুণ! শুধু তাই নয়, অলিম্পিকের শতবর্ষের ইতিহাসে সিঙ্গাপুরের এটা প্রথম সোনা। কে এই পুলের নতুন রাজপুত্র? কে জোসেফ স্কুলিং?

স্কুলিংয়ের আইডল হলেন ফেলপস। স্কুলিংয়ের বয়স যখন ১৩ তখন তার সঙ্গে দেখা হয় কিংবদন্তি ফেলপসের। রিও অলিম্পিকে পরপর চারটি সোনা জয়ী সেই ফেলপস এবারের আসরের সপ্তম দিনে ১০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে হার মানলেন তার ভক্তের কাছে।  স্কুলিং সবাইকে বিস্মিত করে ৫০.৩৯ সেকেন্ডে অলিম্পিক রেকর্ড গড়ে জিতেছেন সোনা। ০.৭৫ সেকেন্ডে এগিয়ে থেকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন তিনি। ফেলপস, দক্ষিণ আফ্রিকার শাড লে ক্লোস ও হাঙ্গেরির লাসলো শেহ ৫১.১৪ সেকেন্ডে সাঁতার শেষ করেছেন। ব্রোঞ্জ জেতেনি কেউ।

স্কুলিং এমনিতেই সিঙ্গাপুরের বয়সভিত্তিক সাঁতারুদের মধ্যে সেরা। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে দেশকে তুলে ধরতে তার আপ্রাণ চেষ্ঠা। তার লক্ষ্য আরও বড় হয় ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের আগে আমেরিকার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ফেলপসের দেখা পেলে। সুযোগ পেয়ে কিশোর স্কুলিং এই কিংবদন্তির সঙ্গে পটাপট কয়েকটি ছবিও তুলে রাখেন। এরপর ফেলপস যখন বেইজিং অলিম্পিকের পুলে নেমে অলিম্পিকের অনেক রেকর্ড ওলটপালট করে দিলেন তখনই কিশোর স্কুলিংয়ের মনে স্বপ্ন উঁকি দিতে থাকে- একদিন সেও অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হবে।

কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তাকে বাড়ি ছাড়তে হলো। স্কুলিংয়ের মা-বাবা যোগাযোগ করলেন ১৯৮৮ সালে সিওল অলিম্পিকে ব্রেস্টস্ট্রোকে ব্রোঞ্জজয়ী সার্জিও লোপেজের সঙ্গে। তাকেই স্কুলিংয়ের প্রধান কোচ হিসেবে মনোনীত করলেন তার বাবা মা। অতঃপর পরিবার পরিজন, বন্ধুবান্ধব ছেড়ে স্কুলিং পাড়ি জমালেন ফ্লোরিডার বলস্ স্কুলে। সেখানেই গুরু লোপেজের সান্নিধ্যে শুরু হলো তার প্রশিক্ষণ।

কঠোর অনুশীলনে নিজেকে উজার করে দিয়ে অল্পসময়েই জোসেফ তার গুরুর প্রিয়ভাজন হয়ে উঠলেন। মাসল বৃদ্ধির জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে জিমে থাকতে হতো। দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য লোপেজ তাকে পরিমিত এবং অতি প্রয়োজনীয় আহার দিতেন। স্কুলিং তার গুরুর প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। যার প্রতিদান পেলেন ২০১১ সালে। ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত সাউথইস্ট গেমে দু দুটি সোনা জিতে নিলেন স্কুলিং। শুধু তাই নয়, পরের বছর অনুষ্ঠেয় লন্ডন অলিম্পিকে যাওয়ার টিকিট পেয়ে গেলেন। কিন্তু এত কম বয়সী কিশোর ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে তেমন কিছু করে দেখাতে পারলেন না। কিন্তু অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করাটাই কম কীসে?

২০১৩ সালে হাইস্কুল শেষ করার পর স্কুলিং ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে স্কলারশিপের অফার পান। কিন্তু সিঙ্গাপুরের স্পোর্টস ইনস্টিটিউট স্কুলিংকে রিও অলিম্পিকের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করতে সরকারের কাছে আবেদন জানান। অসাধারণ এই মেধাবী কিশোরের কথা শুনে সরকার সাথে সাথে সম্মতি প্রদান করে। শুরু হয় নতুন লক্ষ্য অভিমুখে যাত্রা। ইতোমধ্যেই সে সিঙ্গাপুরের ক্রীড়াঙ্গনে বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন স্কুলিং। তার প্রতিভা দেখে বিখ্যাত ক্রীড়াবিদরাও অবাক হয়ে যাচ্ছেন। এরপর এল ২০১৪ সালের কমনওয়েলথ গেমস। ১০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে রুপা জিতে নিলেন স্কুলিং! সিঙ্গাপুরজুড়ে তুলকালাম লেগে গেল! বিশ্বের নামজাদা সাঁতারুরা বুঝতে পারলেন পুলের রাজা হতে আরও একজন প্রস্তুত হচ্ছে! ফেলপসও কি ভেবেছিলেন?

৩২ বছর পর প্রথম সিঙ্গাপুরের ক্রীড়াবিদ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে স্কুলিং জিতে নিলেন সোনা। ২০১৫ সালে রাশিয়ায় ফেলপসের অনুপস্থিতিতে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে শুরু হলো তার রিও অলিম্পিকের পথে যাত্রা। অলিম্পিকের ১০৪ বছরের ইতিহাসে সিঙ্গাপুরের কোন ক্রীড়াবিদ সোনা জিততে পারেনি। স্কুলিং তা অর্জন করলেন। শুধু অর্জনই করলেন না, ফেলপসকে হারিয়ে গড়লেন নতুন ইতিহাস!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *