বিডি নিউজ ৬৪: ‘বয়স ৮০ বছর, গায়ে বল নাই। পেটের জন্নি কামলা খাটি। পরের জমিতি কিষাণ দেই তাই দিয়ে সংসার চালাই। যেদিন কাজে যাই সেদিন খাই আর যে দিন যাই না সেদিন উপবাস থাকি। এখানে আমার চাইতে যারা ভালো আছে, যাদের জমিজমা আছে তারা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, পরিষদের ভিজিএফ ভিজিডি পায় কিন্তু আমারে দেয় না। কি কারণে দেয় না তাও বলে না।’
কথাগুলো বলেন, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ব্যাসপুর ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর গ্রামের আদিবাসী পল্লীর বাসিন্দা নেপাল চন্দ্র কর্মকার। তিনি অভিযোগ করেন, ‘চেয়ারম্যান মেম্বাররা ভোটের সময় চা বিস্কুট আর বিড়ি খাওয়ায়। ভোট হয়ে গেলে আর খবর নেয় না। দেখা হলিও কথা কয় না। আমারা আদিবাসী বলে মনে হয় সরকারের কোনো সুযুগ সুবিধা পাই না। কি দোষ আমাগে।’
শুধু নেপাল কর্মকারই নয়, এমন অভিযোগ ওই আদিবাসী পল্লীর বাসিন্দা, কৃষি শ্রমিক লক্ষ্মী কর্মকার (৬৮), দুলাল কর্মকার (৭০), সুবল কর্মকার (৬৬), প্রেমানন্দ সাধু (৬৯), কালিদাস কর্মকার (৬০), ঝড়ু সাধু (৬২), দেবরানী কর্মকার (৬৫), মিলা রানী কর্মকার (৭০), বাতাসী কর্মকার (৭৮), ছায়া রানী কর্মকার (৭২), কাঠুরে চিত্ত কর্মকারসহ (৭৫) বেশ কয়েকজনের।
তাঁদের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা তিন চার পুরুষ পূর্ব থেকে এখানে বসবাস করছি। এখানে আমাদের জম্ম। বৃটিশ আমলে আমাদের পূর্ব পুরুষ ২১ পরিবারকে এখানে এনেছিল নীল চাষ করতে। আমাদের আদি নিবাস ছিল ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নাগপুর এলাকায়। ভাষা ছিল নাগরী। তখন সবাই বুনো হিসেবে আমাদের চিনতো বা ডাকতো। ধীরে ধীরে পূর্ব পুরুষরা বাংলা ভাষা শিখেছে। আমাদেরকে বাংলা ভাষা শিখিয়েছে। সেই থেকে আমরা বংশানুক্রমে এখানেই বসবাস করে আসছি।
তাঁরা বলেন, বাবা বা ঠুকুরদাদা অভাব অনটনের মধ্যে আমাদের লালন পালন করেছে। তাঁরাও পরের জমিতে কিষাণ দিয়ে বা ধনী লোকের বাড়িতে চাকরের কাজ করে সংসার চালিয়েছে। আমরাও সেরমক আছি। দুই একজনের ছেলে-মেয়ে একটু আধটু লেখাপড়া শিখেছে। তারা কেউ কেউ রাস্তার পাশে সেলুন, চায়ের দোকান কাঠমিস্ত্রীর কাজ করে থাকে। আমরা যারা এখন বৃদ্ধ হয়েছি তাদের তো সরকারিভাবে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার কথা ঠিল। সরকার বিধবাদের বিধবা ভাতা আর বয়স্কদের বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে কিন্তু আমাদের সম্প্রদায়ের কেউ এই ভাতা পাচ্ছে না। এমনকি চেয়ারম্যান মেম্বাররা আমাদের ভিজিএফ বা ভিজিডির কোনো গম চালও দেন না।
আদিবাসী লোকজন আরো বলেন, ভোটের সময় আমাদের খোজ-খবর নেয় না। দেখা হলেও বেশি একটা কথা বলে না। কি দোষ আমাদের। আমরা সরকারি এসব অনুদান থেকে কেনো বঞ্চিত হচ্ছি। সেই সাথে বঞ্চিত হচ্ছি স্বাস্থ্যসেবা ও আমাদের মাতৃ ভাষা থেকেও। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমাদের নতুন প্রজম্ম যেন সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভদ্র বা আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। আর আমরা যারা বৃদ্ধ আছি তাদের বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা পাই সে ব্যবস্থা যেন সরকার চালু করে।
আদিবাসী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি সঞ্চয় কর্মকার বলেন, “গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় ৬০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের বসবাস। একই পল্লীতে ছোট বড় মিলে প্রায় ৬০০ লোক রয়েছে। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সরকারি অন্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শ্রম বিক্রি করে জীবন চলে তাদের। আর্থিক অনটনের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারছে না এখানকার শিশুরা। সেই সঙ্গে নিজেদের মাতৃভাষাও হারাতে বসেছে। মাতৃভাষা নাগরী ফিরে পেতে বিদ্যালয় স্থাপনসহ সরকারি সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন তিনি।
কাশিয়ানী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনিরুজ্জামানের কাছে আদিবাসীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইতিমধ্যে আদিবাসী পল্লীতে ১০টি পাকা ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের আবাসন সমস্যা রয়েছে। আবাসনসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের সমস্যার সমাধান হবে।”
bdnews64 বাংলাভাষায় প্রকাশিত দেশের সর্ববৃহৎ সংবাদ পোর্টাল