বিডি নিউজ ৬৪: তুরস্কের ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে জঙ্গি হামলায় ৪১ জন নিহত এবং ১৪৭ জন আহত হয়েছে। দেশটির সবচেয়ে বড় এই বিমানবন্দরে গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় তিন জঙ্গির নির্বিচার গুলি এবং আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ন্যাটো সহযোগী তুরস্ককে একসময় স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। তবে ইদানীং মধ্যপ্রাচ্যের সহিংসতা সেখানেও ছড়িয়ে পড়েছে।
গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী এ হামলার দায় স্বীকার না করলেও তুরস্ক সরকার এ ঘটনার জন্য ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) দায়ী করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম জানান, হামলায় প্রায় ১৪৭ জন আহত হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই তুরস্কের নাগরিক। তবে নিহতদের মধ্যে বিদেশিরাও আছে। যদিও তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
তুর্কি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন জঙ্গি ট্যাক্সিতে করে বিমানবন্দরে এসেছিল। ইউরোপের তৃতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দরটির টার্মিনালে যাত্রীদের
ওপর তারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে বিস্ফোরণে নিজেদের উড়িয়ে দেয়। হামলার পরে বিমানবন্দরের সব ফটক সিল করে দেওয়া হয়। তুরস্কের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক টার্মিনালের প্রবেশপথের কাছে পুলিশকে লক্ষ্য করেও গুলি চালিয়েছিল জঙ্গিরা। তবে রক্ষীদের পাল্টা জবাবে তারা কেউই আন্তর্জাতিক টার্মিনালের ভেতরে ঢুকতে পারেনি।
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি জানিয়েছেন, তদন্ত শুরু হয়েছে। কোনো জঙ্গি লুকিয়ে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চলছে চিরুনি তল্লাশি।
চলতি বছরে এই নিয়ে চারটি জঙ্গি হামলা হলো তুরস্কে। তবে কোনো হামলার দায়ই কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী স্বীকার করেনি।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে এই হামলা একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা হিসেবে কাজ করা উচিত। আজ ইস্তাম্বুলে যে বোমা বিস্ফোরিত হলো, তা বিশ্বের যেকোনো শহরে হতে পারত। তবে চড়া মূল্য দেওয়ার পরও উঠে দাঁড়ানোর শক্তি তুরস্কের রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাস দমনের লড়াইয়ে তুরস্ক থাকবে।’
হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। লোকজন দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করে। হামলার পর বিমানবন্দরে সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের বিভিন্ন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরে গতকাল সকালে আবারও বিমান চলাচল শুরু হয়েছে বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জানান। এর আগে ওই বিমানবন্দরের কিছু ফ্লাইট অন্য পথে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি টার্মিনাল ভবনে প্রবেশ করছে এবং তার আশপাশে থাকা মানুষজন ছুটে পালাচ্ছে। টার্মিনাল পুলিশ তাকে গুলি করে, সে ২০ সেকেন্ডের মতো মাটিতে পড়ে থাকে এবং তারপর নিজেকে উড়িয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন পল রস বলেন, ‘সে (হামলাকারী) আপাদমস্তক কালো রঙের পোশাক পরে ছিল। তবে তার মুখ খোলা ছিল। আমরা একটি কাউন্টারের পেছনে মাথা নিচু করে ছিলাম। এক ফাঁকে আমি দাঁড়াই এবং তাকে দেখতে পাই। পর পর দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। ওই সময় সে গুলি করা বন্ধ রেখেছিল।’ আরেক প্রত্যক্ষদর্শী এইলুল কায়া বলেন, ‘হামলার স্থানে চারপাশে রক্ত ছিটিয়ে আছে। আমি আমার এক বছর বয়সী সন্তানের চোখ হাত দিয়ে ঢেকে দৌড়ে পালিয়ে এসেছি।’
এই ঘটনায় নিন্দা শুরু হয়েছে পুরো বিশ্বে। যুক্তরাষ্ট্র একে অভিহিত করেছে ‘জঘন্য হামলা’ হিসেবে। তুরস্ককে সব রকম সাহায্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই আশ্বাস এবং ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। সন্ত্রাস-উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক তৎপরতা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নিজেদের তিক্ত সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে তুরস্কের ওপর থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে রাশিয়া। গতকাল তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
bdnews64 বাংলাভাষায় প্রকাশিত দেশের সর্ববৃহৎ সংবাদ পোর্টাল