মিটারে চলছে না সিএনজি অটোরিকশা

বিডি নিউজ ৬৪: গাবতলী থেকে শাজাহানপুরে যাবেন রাখাল বেপারী। মানিকগঞ্জের কাকুরিয়া গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় গাবতলী টার্মিনালে বাস থেকে নামেন তিনি। এটি সোমবার (২৭ জুন) দুপুর ১২টার কথা। শুকতারা সার্ভিস (বাস) থেকে গাবতলী টার্মিনালে নেমে বাসায় ফেরা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন পেশায় ক্ষুদ্র এ ব্যবসায়ী।

সিএনজি অটোরিকশা (কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস) আছে টার্মিনালের আশপাশে। মিটারে নয়, চুক্তিতে যেতে আগ্রহ অটোরিকশা চালকদের। সিএনজি চালকদের একেকজন একেক রকম ভাড়া চাইছেন। কেউ গাবতলী থেকে শাজাহানপুর যেতে হাঁকলেন চার’শ, আবার কেউ সাড়ে চার’শ টাকা। তবে তাড়া থাকায় দরাদরিতে না গিয়ে চালকের দাবি মেনে উঠে গেলেন এক সিএনজিতে।

সিএনজিতে ওঠার আগে রাখাল বেপারী আক্ষেপ করে বলেন, ‘কোথাও নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, নির্দেশনা ছিল চালাতে হবে মিটারে। কিন্তু কেউ তা মানছেনা। ক’দিন নিয়মে চললো, পরে ওই নিয়মের আর বালাই নেই। কিলোমিটারে যে টাকা বাড়ানো হয়েছে তা নিয়ে ওইসময় আপত্তি তুলেছিল যাত্রীরা।’

ভাড়া দ্বিগুণ করার পরও যাত্রীদের কাছ থেকে খেয়াল-খুশিমতো ভাড়া আদায় করার এমন অভিযোগ উঠছে সিএনজি চালকদের বিরুদ্ধে। যাত্রীদের অভিযোগ- কোনো নিয়মনীতির বালাই নেই। মিটার বন্ধ রেখে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়ার দুই থেকে তিনগুণ বেশি আদায় করছেন চালকরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় চলছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। প্রতারণার পাশপাশি প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতিতে পড়ছেন সিএনজি যাত্রীরা।

সিএনজি অটোরিক্সায় প্রথম দুই কিলোমিটার ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ৭ টাকা ৬৪ পয়সার থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা হারে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়ার পরও মিটার  কার্যকর নেই। এতে যাত্রীভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। মালিকপক্ষ, বিআরটিএ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ও ট্রাফিক পুলিশ যৌথ বৈঠক করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়। কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ানোর পাশাপাশি ওয়েটিং চার্জ করা হয়েছে ১ টাকা। যানজটের এ নগরীতে এটা কোন যুক্তিতে বাড়ানো হলো তার ব্যখ্যা দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

বিআরটিএ সুত্রমতে, বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে রাজধানীতে প্রায় ২৫ হাজার সিএনজি চলাচল করছে। একই নম্বর প্লেটে সিএনজি চলাচলের ঘটনাও পুলিশের কাছে ইতিপূর্বে ধরা পড়েছে। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত মালিকানায় গাড়ি এনে প্রায় ১০ হাজার সিএনজি অটোরিকশা পুলিশসহ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাজধানী ও আশপাশের জেলা শহরে বাণিজ্যিকভাবে চলছে। এসব সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রাইভেট সিএনজি নামে পরিচিত।

সিএনজি চালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাইভেটগাড়ি ও অবৈধ সিএনজি চালকরাই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।’ তার দাবি, বৈধ সিএনজি চালকরা মিটারে চলে।

প্রাইভেট ও অবৈধ সিএনজি চালকরা কিভাবে চলছে, প্রশাসন কিছু বলছে না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে শহীদুল বলেন, ‘রাজধানীতে ১৫ হাজার সিএনজির মধ্যে ১০ হাজার গাড়িই মিটারে চলে না। এসব গাড়ি মাসিক ৫ হাজার টাকা করে সংশ্লিষ্ট পুলিশকে চাঁদা দিচ্ছে। একটি গাড়ীর ৫ হাজার টাকা হলে ১০ হাজার গাড়িতে মাসে দেয়া হচ্ছে ৫ কোটি টাকা।’

শহীদুল বলেন, ‘১৫ হাজারের মধ্যে ৫ হাজার গাড়ির ডিজিট্যাল নাম্বারপ্লেট নেই। বিআরটিএ ও পুলিশ দেখেও কিছুই বলে না।’

সিএনজি অটোরিক্সা মিটারে চলছে কি না জানতে চাইলে একটি প্রাইভেট সিএনজি অটোরিক্সার (ঢাকা মেট্রো-থ ১৪০২৬৮) চালক মো. হোসেন বলেন, ‘প্রাইভেট গাড়ির মিটার লাগে না। মিটার ছাড়াই সব প্রাইভেট গাড়ি চলছে।’

তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ঢাকা-মেট্রো-থ-১২৮৯৪২ নম্বর গাড়ির চালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমরা এভাবেই চলছি। আমাদের পুলিশ কিছু বলে না।’

অপর সিএনজি চালক মো. সবুজ মিয়া বলেন, ‘পুলিশ যদি প্রতি সিএনজি অটোরিকশা থেকে মাসে ৫ হাজার করে টাকা পায়, পুলিশ কেন কথা বলবে। এ কারণেই যাত্রীদের ইচ্ছেমতো জিম্মি করে বেশি ভাড়া আদায় করছে চালকরা। মিটারে ২০০ টাকার ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৪’শ টাকা। মিটারে ১৭০ টাকার ভাড়া নেয়া হচ্ছে আড়াই’শ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা। আইন আছে মিটারে ভাড়া না নিলে ২ মাসের জেল। তার পরেও সিএনজি চালকরা যাত্রীদের জিম্মি করে ইচ্ছামত ভাড়া নিচ্ছে।’

মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, চালকরা মিটারে যেতে অনিচ্ছুক। আবার অধিকাংশ সিএনজি অটোরিকশার মিটারই নষ্ট।

রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় ঢাকা মেট্রো-থ ১৪-৩৬৮৭ নম্বরের একটি অটোরিকশার ড্রাইভারকে মিটার চলছে না কেন জিজ্ঞেস করতেই ড্রাইভার বলেন, ‘চলছে স্যার।’

এসময় ওই সিএনজির যাত্রী তাহের ভেতর থেকে বলেন, ‘ওর মিটার নষ্ট। আর অন্য সিএনজি অটোরিকশা রাজি হচ্ছে না বলেই বাধ্য হয়ে তাকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই যেতে হচ্ছে।’

একইভাবে ঢাকা মেট্রো থ-১৩-৩৪১০ নম্বরের অটোরিকশায় গুলশান থেকে শাহবাগ যেতে ২০০ টাকা ভাড়ায় চুক্তি করে উঠতে হয়েছে কবির হোসেনকে। তবে তাকে আগে থেকেই বলা হয়েছে, রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ বা মোবাইল কোর্ট ধরলে মিটারে যাচ্ছে বলতে হবে। নইলে তাকে নেয়া হবে না। তাই প্রয়োজনের কারণেই ড্রাইভারের কথায় রাজি হয়ে অটোরিকশায় উঠেছেন। তবে মিটারে চলছে দেখানোর জন্য তা চালিয়ে রাখা হয়েছে। গুলশান থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ২০০ টাকায় চুক্তি হলেও মহাখালী পৌঁছতেই মিটারে ১৭০ টাকা উঠে আছে। মিটার ঠিক থাকলে গুলশান থেকে মহাখালী ১৭০ টাকা ওঠে কি করে জিজ্ঞেস করতেই ড্রাইভার দ্রুত চালিয়ে চলে যান।

একই অবস্থা দেখা যায় ঢাকা মেট্রো থ-১৩-৩৮৯৫, ঢাকা মেট্রো থ- ১৪-২০৪৮, ঢাকা মেট্রো থ-১৪-২৮৪৯,ঢাকা মেট্রো থ- ১৪-২০১৭ অটোরিকশার ক্ষেত্রে। মিটার চলছে দেখানো হলেও যাত্রীদের তোলা হয়েছে ইচ্ছে মত চুক্তি করে। এর এভাবে গন্তব্য ভেদে আগের মতই যাত্রীদের কাছে ভাড়া হাঁকছেন।

রাজধানীর ১৫ হাজার অটোরিকশার মধ্যে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারেরও কম বিআরটিএ থেকে ‘মিটার সঠিক’ মর্মে প্রত্যয়নপত্র নিয়েছে। বাকিগুলো এখনো প্রত্যয়ন নেয়নি। বিআরটিএ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, সাত হাজারের বেশি অটোরিকশা সঠিকভাবে মিটার প্রতিস্থাপন করেনি। এ জন্যই প্রত্যয়নপত্র নিতে আসেনি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘পর্যবেক্ষণকালে আমরা জানতে পেরেছি যাত্রীদের চাহিদার তুলনায় এই বাহনের সংখ্যা কম। ফলে চালকদের ইচ্ছার কাছে যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি ভাড়া দিয়েও গোপন চুক্তিতে যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছে যাত্রীরা। অতিরিক্ত দৈনিক জমা ও আনুসঙ্গিক খরচের পুরোটাই যাত্রীদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা অভিযোগে জানান।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া নিলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘সিএনজি অটোরিকশা মিটারে চলছে কি না তা দেখতে ইতিমধ্যে চালক, মালিক, বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। এ টিম কাজ শুরু করছে। এ ছাড়া রাস্তায় বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকবে। যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *