যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে চার দশকের বন্ধন ছিন্ন করার পক্ষেই রায় দিয়েছে দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ। ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট পড়েছে ৫২ শতাংশ আর ইইউয়ে থাকার পক্ষে ৪৮ শতাংশ। গতকাল শুক্রবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের ফল প্রকাশের পরপরই পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেবেন আগামী অক্টোবরে।
‘ব্রেক্সিট’ নামে অভিহিত এ গণভোটের ফল প্রকাশের পরই যুক্তরাজ্যের মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ড স্টার্লিংয়ের দর ডলারের বিপরীতে ১০ শতাংশ পড়ে গেছে। ১৯৮৫ সালের পর এক দিনে পাউন্ডের এত বেশি দরপতন আর হয়নি। টালমাটাল বিশ্বের পুঁজিবাজারও। এদিকে পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য যুক্তরাজ্যকে ছাড়াই জরুরি বৈঠক ডেকেছে ইউরোপীয় কমিশন।
ইইউ গঠনের পর যুক্তরাজ্যই প্রথম দেশ, যারা ২৮ জাতির এই জোট ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ গণভোটের ফল শুধু যুক্তরাজ্যের ভাগ্য বদলাবে না, বদলে দেবে ইউরোপকে এবং আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকে। প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়েই।
গণভোটের রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যায়িত করে ইইউ ছাড়ার পক্ষে জোর প্রচারকারী যুক্তরাজ্যের ইনডিপেনডেন্স পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজ বলছেন, জনগণ ‘স্বাধীনতার’ পক্ষে রায় দিয়েছে। অন্যদিকে ইইউয়ে থাকার পক্ষে প্রচারকারী নেতারা ভোটের ফলকে চিহ্নিত করছেন ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে।
ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির গণভোটের রায় ইইউয়ের বাকি ২৭ সদস্য দেশের রাষ্ট্রনেতার কপালেও ভাঁজ ফেলেছে। এ ফল দেখে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেনসহ বেশ কয়েকটি দেশের কট্টর ডানপন্থী দলগুলো ইইউ ছাড়ার প্রশ্নে নিজ নিজ দেশেও একই রকম গণভোটের দাবি তুলেছে।
ভোটের ফল প্রকাশের পর গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে স্ত্রী সামান্থাকে নিয়ে এসে এক টেলিভিশন ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ডেভিড ক্যামেরন। তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো সময় আসে জনগণকে জিজ্ঞেস করার, তারা কী চায়? তাদের ইচ্ছার প্রতি অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে।’
যুক্তরাজ্যের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালনকে গৌরবের মন্তব্য করে আবেগাক্রান্ত ক্যামেরন বলেন, ‘পরবর্তী গন্তব্যে দেশকে নিয়ে যেতে চালকের ভূমিকায় থাকা আর আমার জন্য ঠিক হবে বলে মনে করি না। এই জাহাজের এখন একজন নতুন ক্যাপ্টেন লাগবে।’ আগামী অক্টোবরে ক্ষমতাসীন টোরি দলের কাউন্সিলে নতুন প্রধানমন্ত্রী ঠিক করা হবে বলে জানান তিনি। পরে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা করতে যান প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন।
৪৩ বছর আগে ১৯৭৩ সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটিতে (ইইসি) যোগ দেওয়ার প্রশ্নে গণভোট দিয়েছিল যুক্তরাজ্যবাসী। তাতে ৬৭ শতাংশ ইইসির পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ওই ইইসিই পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রূপ নেয়।
এবারের গণভোটে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের পাশাপাশি স্পেন উপকূলের অদূরে ব্রিটিশ শাসিত ক্ষুদ্র ভূখণ্ড জিব্রাল্টারের অধিবাসীরাও তাঁদের রায় দিয়েছেন। চার কোটি ৬৫ লাখ এক হাজার ২৪১ জন ভোটারের মধ্যে ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন এক কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৭৪২ জন। আর ইইউয়ে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন এক কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ জন। অর্থাৎ ইইউ ছাড়ার পক্ষে (লিভ) ৫১.৯ শতাংশ এবং ইইউয়ে থাকার পক্ষে (রিমেইন) ৪৮.১ শতাংশ ভোট পড়েছে। ভোটের আগেই ধারণা করা হয়েছিল যে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি, ফলাফলেও তার প্রতিফলনই ঘটেছে।
গোটা যুক্তরাজ্যের উত্তর অংশ ইইউতে থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, বিপরীতে দেশের দক্ষিণের প্রায় পুরো অংশ এই জোট ছাড়ার পক্ষে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিচ্ছেদপন্থীরা জয়ী হলেও স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। তবে সবখানেই ব্যবধান খুবই কম। ইংল্যান্ডে এক কোটি ৫২ লাখ ইইউ ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। বিপরীতে থাকার পক্ষে ভোট পড়েছে এক কোটি ৩৩ লাখ। এখানে ভোটের হার ৭৩ শতাংশ। ওয়েলসেও রায় গেছে ইইউ ছাড়ার পক্ষে। মোট ভোটারের ৭২ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট সাড়ে আট লাখ, থাকার পক্ষে পৌনে আট লাখ। স্কটল্যান্ডে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন সাড়ে ১৬ লাখ, ছাড়ার পক্ষে ১০ লাখ। এখানে ভোটের হার ৬৭ শতাংশ। একইভাবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাড়ে চার লাখ ভোটার ইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। সাড়ে তিন লাখ ভোট দিয়েছেন ছাড়ার পক্ষে। এখানে ৬৩ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। রাজধানী লন্ডনের বেশির ভাগ ভোটার ইইউতে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখানে ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে থাকার পক্ষে, বাকি ৪০ শতাংশ বিপক্ষে। মোট ভোটের হার ৭২ দশমিক ২ শতাংশ।
গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ৪০ হাজার কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়। এরপর ব্যালট বাক্সগুলো ৩৮২টি কেন্দ্রে নিয়ে শুরু হয় গণনা। ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে একযোগে ফল ঘোষণা শুরু হয়। সব ফল যোগ করে ম্যানচেস্টার টাউন হল থেকে গতকাল সকালে পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণা হয়।
যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় জোট থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে কিছু ডানপন্থী রাজনীতিবিদের উদ্যোগে ১৯৯১ সালে গঠিত হয় ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টি। দলটি ২০১৩ সালে স্থানীয় কাউন্সিল নির্বাচনে সাফল্য পায় এবং প্রতিনিধিত্বের বিচারে যুক্তরাজ্যের চতুর্থ শক্তিশালী দলে পরিণত হয়। ইনডিপেনডেন্স পার্টির এই উত্থান কনজারভেটিভ পার্টির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে অনেকটা চাপের মুখেই ইইউ প্রশ্নে গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হন কনজারভেটিভ নেতা ক্যামেরন, সেই ভোটের ফলই এখন তাঁর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্যামেরন ইইউর পক্ষে অবস্থান জানালেও তাঁর দলের একটি বড় অংশ বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ক্যামেরন বলেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে ভোট দিলে তা হবে ‘একটি বিরাট ভুল’ এবং তা দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। বিরোধী লেবার পার্টির বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রুশনারা আলী ও টিউলিপ সিদ্দীকও ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। অন্যদিকে ইইউ ত্যাগের পক্ষের অন্যতম নেতা কনজারভেটিভ পার্টির মাইকেল গোভ প্রধানমন্ত্রীর আশঙ্কা নাকচ করে জনগণকে বলছিলেন, ‘ভোট ফর হোপ’।
ভোটের ফল দেখে ইইউ ছাড়তে অন্য দেশগুলো যেমন উদ্বুদ্ধ হচ্ছে, তেমনি যুক্তরাজ্যভুক্ত দেশগুলোতে আলাদা ফল হওয়ায় ‘যুক্তরাজ্য’র ঐক্যও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভোটের ফলের পর স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারগিওন বলেছেন, রায় বলছে স্কটল্যান্ডের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে থাকার শক্তিশালী বার্তা জানিয়ে দিয়েছে। ২০১৪ সালে হওয়া গণভোটে স্কটল্যান্ডের বেশির ভাগ নাগরিক যুক্তরাজ্যে থাকার পক্ষে রায় দিলেও ব্রেক্সিট ভোটের পর সেই অবস্থান বদলে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন তিনি।
ভোটের এ ফল যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশের সম্পর্কে বাঁকবদল হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর ফলে গ্রিসকে দেউলিয়াত্বের হাত থেকে রক্ষা করতে ইইউর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে; সিরিয়াসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের নিয়েও জোটটি বিপদে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইইউ ছাড়ার কারণে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ইইউভুক্ত অন্য দেশগুলোতে অবাধ যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হবে; ইউরোপভুক্ত অন্য দেশের নাগরিকরাও দেশটিতে আগের মতো সহজে ঢুকতে পারবে না। আগের মতো চলাচল অবাধ করতে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাজ্যকে আবার চুক্তি করতে হবে।
গণভোটের ফল ঘোষণার পর পরই ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদ হচ্ছে না যুক্তরাজ্যের। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া লিসবন চুক্তিকে বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম সাংবিধানিক ভিত্তি। তারই আর্টিকল-ফিফটিতে বলা হয়েছে এই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার তরিকা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আর্টিকল-ফিফটি অনুযায়ী জোট ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তারপর অন্তত দুই বছর বিচ্ছেদসংক্রান্ত আলোচনা চলতে পারে। ওই আলোচনাতেই ঠিক হবে, যুক্তরাজ্য কোন প্রক্রিয়ায় ইইউ ছাড়বে। এর আগে এ ধরনের নজির না থাকায় ইইউ আর যুক্তরাজ্যকেই লিখতে হবে বিচ্ছেদের রীতিনীতি।
যুক্তরাজ্যের গণভোটের প্রভাবে ইইউ নাজুক অবস্থায় পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মার্টিন শুলজ। ইইউয়ের ‘খুবই ভালো’ প্রস্তুতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
ব্রেক্সিটের ফলে জোট দুর্বল হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক। তিনি বাকি রাষ্ট্রগুলোকে জোটবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। ব্রিটেনকে ছাড়াই ২৭ দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে আগামী সপ্তাহে একটি সম্মেলনের আহ্বান জানান তিনি।
ইইউর পক্ষ থেকে এক যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাজ্য সরকার যত দ্রুত সম্ভব জনগণের রায় বাস্তবায়ন করবে বলে আশা করছি। ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যকে ইইউর ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে পাওয়া যাওয়ারও আশা করছি।’
ব্রিটিশ জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ইইউর সঙ্গে অপরিহার্য অংশীদারত্ব বজায় থাকবে এবং অটুট থাকবে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিশেষ বন্ধন। যুক্তরাজ্যের ন্যাটোর সদস্য পদও বজায় থাকবে বলে জানান তিনি। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল গণভোটের ফলকে ‘গভীর দুঃখের’ উল্লেখ করে বলেন, ইউরোপ ও ইউরোপীয় ঐক্যের ওপর এটা একটা ধাক্কা, তাতে সন্দেহ নেই।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্যের এ সিদ্ধান্তে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। কিন্তু সিদ্ধান্তটা তাদের এবং সেটাকে আমাদের সম্মান জানাতে হবে।’
bdnews64 বাংলাভাষায় প্রকাশিত দেশের সর্ববৃহৎ সংবাদ পোর্টাল