২০ দিন পর জানতে পারি বাবা-মা’সহ কেউ নেই: প্রধানমন্ত্রী

বিডি নিউজ ৬৪:  ‘আব্বা পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঘুরে দেখতে বলেছিলেন। জার্মানি পৌঁছে আমরা আব্বা-আম্মাকে চিঠি লিখতাম। রেহানা চিঠি লিখতে খুবই ভালোবাসতো। কিন্তু তাঁর শেষ চিঠিটা আর পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি। তাঁর আগেই সব শেষ হয়ে যায়।’

কথা বলতে গিয়ে বার বারই গলা ধরে আসছিল প্রধানমন্ত্রীর। এ সময় পুরো মিলনায়তনে ছিল পিনপতন নীরবতা। হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে দেখা গেছে অনেককেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

৭৫ এর ১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, মাত্র পনের দিন আগে দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়েছিলাম। ১৫ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু যাওয়ার কথা। তাই বিদেশ আমি যেতে চাইনি। দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দেশ ছাড়ি। আমার সঙ্গে রেহানাকেও দেওয়া হয়।

পচাত্তরের ১৫ আগস্টে বেলজিয়ামে ছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক রাজনৈতিক- ভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হলেও বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আমাদের কোন রকম সহযোগিতা দিতে অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা যেন তাঁর কাছে বোঝা হয়ে গেলাম।…তিনি জার্মাানীতে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী সাহেবকে ফোন করে বললেন আাপনি যে মেহমান পাঠিয়েছেন তাদের নিয়ে যান।… আমাদেরকে জার্মানী যাবার জন্য তার (রাষ্ট্রদূতের) গাড়িটা দিয়ে পর্যন্ত সীমান্তে এগিয়ে দিয়ে সহযোগিতা করতে সে রাজি হল না। বলল গাড়ি নষ্ট।’

দূতাবাসের ফাষ্ট সেক্রেটারি যিনি প্রধানমন্ত্রীর ক্লাসমেট ছিলেন তাঁর এবং তাঁর স্বামীর সহযোগিতায় তাঁরা সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে পৌঁছলে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী তাদের জার্মানীতে নিয়ে যান বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দিল্লিতে আসলাম ২৪ আগস্ট। আমরা তখনও জানি না কতো বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে। ০৪ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি জানালেন, আমাদের পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। আমি ভেবেছিলাম মা, শেখ রাসেল ওরা হয়তো বেঁচে আছে। কিন্তু কেউ নেই।’

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার চিন্তা করছিলেন জানিয়ে বলেন, ‘তারপর মনে হলো দেশে আসবো। কিন্তু ততক্ষণে যারা সরকারে এসেছে তারা আমাদেরকে দেশে ফিরতে দেবে না। এরপর ক্ষমতায় আসলো জিয়াউর রহমান। তিনিও খবর পাঠালেন, যেন আমরা কেউ দেশে ফিরতে না পারি। পরে আমরা সেখানেই আশ্রয় নিয়ে থেকে গেলাম।’

ছয়টি বছর বলতে গেলে এক রকম ভারতেই ছিলেন বলেও প্রধানমন্ত্রী জানান।  তিনি বলেন, মাঝে ছোট বোন শেখ রেহানার বিয়ে হয়। আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমান এই বিয়ে আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। লন্ডন থেকে শেখ রেহানার শ্বশুর-শাশুড়ি এসে নিয়ে যান রেহানাকে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি পরিবারের একমাত্র বেঁচে যাওয়া সদস্য। অথচ আমিই তার বিয়েতে যেতে পারিনি। কারণ, আমার কাছে বিমান ভাড়া ছিল না। পরে ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি লন্ডনে যাওয়ার টিকিট আর আবাসনের ব্যবস্থা করে দেন। এরপর সন্তান সম্ভবা বোনকে দেখতে লন্ডন যান বলে জানান শেখ হাসিনা।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দায়িত্বে থাকবো এ চিন্তা কখনও করিনি। কিন্তু দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে হবে-এটা জানতাম। ১৯৮১ সালে আমাকে যখন সভাপতি নির্বাচিত করা হয় তখন দিল্লী থেকে ফিরে আসি। ১৭ মে যখন দেশে ফিরে আসলাম তখন লাখো মানুষের ঢল।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *