বিডি নিউজ ৬৪: ‘মাদকের ছোবল থেকে দূরে রাখতে ছেলেকে বিদেশে পড়িয়ে উচ্চ শিক্ষিত করলেও সেই ছেলে চলে গেল বিপথে।’ বললেন নিখোঁজ হওয়া বগুড়ার ব্যারিস্টার একেএম তাকিউর রহমান শিফাতের বাবা আব্দুল খালেক।
শিফাত তার স্ত্রী রিজিতা রাইলা ইকবাল ও ১৮ মাসের শিশু সন্তান রোমাইশা বিনতে তাকিকে নিয়ে এক বছরেরও আগে নিখোঁজ হয়। পরিবারের ধারণা শিফাত বিপথে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। বর্তমানে সে তুরস্ক কিম্বা সিরিয়ায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বগুড়া সদর থানায় হাজির হয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর শিফাতের বাবা আব্দুল খালেক। তিনি জানান, গত ৯ জুন ২০১৫ সালে ঢাকার কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন তিনি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল, আমার ছেলে একেএম তাকিউর রহমান স্বপরিবারে ঢাকার বশিরউদ্দিন রোড ১৪ লেকসার্কাস, ফ্লাট ৮/বি ঠিকানায় বসবাস করা অবস্থায় ৪ এপ্রিল ২০১৫ সালে ছেলে স্ত্রী রিজিতা রাইলা ও আমার নাতনী ১৮ মাসের রোমাইশাকে নিয়ে ওমরা হজের কথা বলে চলে যায়। তারপর আর দেশে ফিরে আসেনি।
বগুড়ার শহরের কালিতলার বাসিন্দা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক জানান, কালিতলা এলাকা ছিল মাদকের আড্ডা। ছেলে মাদকে জড়িয়ে যাবে সেই ভয়ে তাকে ৩য় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ভারতের শিলিগুড়ি মাউন হারমান মিশনারি স্কুলে ভর্তি করে দেই। তারপর সেখান থেকে একই এলাকার রগভেলি স্কুলে ‘ও’ লেভেলে ভর্তি করাই। ‘ও’ লেভেল পাশ করে ২০০৬ সালে ঢাকার লন্ডন কলেজ অব লিগাল স্টাডিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘এ’ লেভেলে ভর্তি করে দেই। সেখান থেকে পাশ করার পর যুক্তরাজ্যে ক্যান্টি ইউনিভাসিটিতে আইন বিষয়ে পড়তে যায়। ২০১০ সালে ‘বার এট ল’ পাশ করার পর দেশে ফেরে। পরে ঢাকার কলা বাগানে বাসা ভাড়া নিয়ে আইন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি বে-সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন।
খালেক আরো জানান, ভারত থেকে পড়ালেখা করে আসার পর এবং দেশে থাকা অবস্থায় শিফাত একজন স্মার্ট ছেলের মতো ঘোরাফেরা করতো। কখনও বা কানে দুল লাগিয়ে গিটার হাতে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো। মাঝে মাঝে চুল বড় করে মেয়েদের মতো মাথায় বেণী করতো। এসব বিষয়ে ধমকিয়ে নামাজ পড়ার কথা বললেও সে নামাজ পড়তো না। কিন্তু যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করার শেষ দিকে তার আচার আচারণে পরিবর্তন ঘটে। বার এট ল করার আগে সে দাড়ি রাখে।
২০১১ সালে দেশে ফেরার পর সে নামাজ-রোজা নিয়মিত করতে থাকে। তবে তিনি জানান, যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করা অবস্থায় সিলেটের এক ইমামের মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। ওই ইমামের ছেলে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিফাতের সঙ্গে পড়ালেখা করতো।
শিফাতের বাবা জানান, ওমরা হজে যাওয়ার আগে তার শ্বশুর চট্টগ্রামের কর্নেল (অব.) ইকবাল দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি দেশে ফিরে আসার পর তাকে হজে যাওয়ার কথা বললেও শিফাত তা না শুনে আগেই চলে যায়। আমিও (আব্দুল খালেক) তাকে পরে যেতে বলেছিলাম। কিন্ত শিফাত জানায়, কম খরচে আমাদের সার্কেলের সঙ্গে হজে যাচ্ছি। কোনো সমস্যা নেই।
আব্দুল খালেক জানান, হজে যাওয়ার পর ওই বছর ১৩ এবং ১৪ এপ্রিল আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। সে জানায় ২২ এপ্রিল দেশে ফিরব। তারপর আর ফিরে আসেনি। ৩ মাস পর হঠাৎ অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন দিয়ে সংক্ষিপ্ত কথা বলে। শুধু জানায়, ভালো আছি। কোথায় আছে তা বলেনি।
আব্দুল খালেক আরো জানান, কয়েক মাস পর তার শ্যালক সাদমানের সঙ্গে শিফাতের কথা হয়। শিফাত তখন তাকে জানিয়েছিল সে তুরস্কে রয়েছে। শিফাতের বাবা আব্দুল খালেকের ধারণা শিফাত বিপথে গিয়ে তুরস্ক কিম্বা সিরিয়ায় অবস্থান করছে।
শিফাতের নানা আইয়ুব উদ দ্দৌলা বেনু বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে শিফাত দেশের বাইরে পড়ালেখা করতে গিয়ে বাবা মার কাছ থেকে দূরে চলে যায়। বাবা মার প্রতি পারিবারিক যে বন্ধন থাকে তা থেকে সে ছিল বঞ্চিত। জীবনের বেশিটা সময় ছিল একাকী। যখন সে বুঝতে শিখলো তখন তার বাবা-মার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সব কিছু মিলেই শিফাতের কিশোর ও শৈশব জীবনে একটা বড় ধরনের ভালবাসার ঘাটতি ছিল। এ কারণে সে বিপথে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকতে পারে।
bdnews64 বাংলাভাষায় প্রকাশিত দেশের সর্ববৃহৎ সংবাদ পোর্টাল