মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল আর নেই

বিডি নিউজ ৬৪: বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী শিরিন বানু মিতিল আর নেই। বুধবার (২১ জুলাই) মধ্যরাতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তার পরিবার সূত্র জানিয়েছে, বুধবার রাত ১১টার দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।

একাত্তরের রণাঙ্গণের সাহসী এই নারীর জন্ম ১৯৫১ সালের ২রা সেপ্টেম্বর পাবনা জেলায়। বাবা খোন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ও মা সেলিনা বানু। বাবা ছাত্রজীবনে ও ১৯৫২ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। মা পাবনা জেলার ন্যাপ সভানেত্রী এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের এমপি ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হওয়ার ফলে নিজেও ছিলেন রাজনীতি সচেতন। ছোটবেলা থেকেই ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন তিনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। এছাড়াও ১৯৭০-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়ন এর সভানেত্রী এবং কিছু সময়ের জন্য পাবনা জেলা মহিলা পরিষদের যুগ্ম সম্পাদিকা ছিলেন।

২৫শে মার্চ ১৯৭১ সালে দেশের অন্যান্য স্থানের মত পাবনা জেলাও পাকহানাদারদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। সাধারণ মানুষের উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচার। ২৭শে মার্চ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয় পাল্টা আক্রমণ। ২৭শে মার্চ পাবনা পুলিশলাইনে যে যুদ্ধ সংগঠিত হয় সেখানে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। তাই নারী হয়ে শত প্রতিকূলতার মাঝে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এক আত্মীয়ের কাছে মাত্র ত্রিশ মিনিটে থ্রি নট থ্রি চালনা শিখে ফেলেন। কিন্তু নারী হিসেবে সে সময়কার সমাজে সম্মুখ যুদ্ধে যাওয়া ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার। তাই তিনি শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতাকে অনুসরণ করে পুরুষের পোশাক পরে পুরুষবেশে যুদ্ধে যোগ দেন।

২৮শে মার্চ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৩৬ জন পাকসেনার সঙ্গে জনতার এক তুমুল যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সেই যুদ্ধে তিনি ছিলেন একমাত্র নারী যোদ্ধা। এই যুদ্ধে ৩৬ জন পাকসেনা নিহত এবং ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। এছাড়াও ৩১শে মার্চ পাবনার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপিত হয়। ৯ এপ্রিল নগরবাড়িতেও এক প্রচণ্ড যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সে সময় কন্ট্রোল রুমের পুরো দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

এরপর ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক মানব ঘোষ তার ছবিসহ পুরুষ সেজে যুদ্ধ করার খবরটি পত্রিকায় প্রকাশ করে দিলে তাঁ পক্ষে আর পুরুষ সেজে যুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তার যুদ্ধ থেমে থাকেনি। পরবর্তীতে পাবনা শহর পাকবাহিনী দ্বারা দখল হলে তিনি ২০ এপ্রিল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখানে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত একমাত্র নারীদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ‘গোবরা’য় যোগ দেন। পরবর্তীতে মেজর জলিলের নেতৃত্বে পরিচালিত ৯নং সেক্টরে যোগ দেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু ছিলেন তিন সন্তানের জননী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রি-ট্রাস্ট নামে একটি এনজিওর পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি আত্মীয়-স্বজন ও অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *