বিডি নিউজ ৬৪: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর জীবনের বেশিরভাগ সময় সৌদি আরবের জোরপূর্বক দাড়ি রাখানোদের সঙ্গে কাজ করেছেন আহমেদ কাসেমি আল-ঘামদি। কমিশন ফর দ্য প্রমোশন অব ভার্চু অ্যান্ড দ্য প্রিভেনমন অব ভাইস বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। এরা ধর্মীয় পুলিশ হিসাবে পরিচিত। তারা পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে ইসলামিক সংস্কৃতিকে বাঁচাতে কাজ করতেন।
মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীদের ধরতে কাজ করেন তারা। তবে বেশিরভাগ সময় যায় সাধারণ মানুষের আচার-আচরণ ও মূল্যবোধ পরিশোধিত করতে। এতে সৌদি কেবল পশ্চিমা বিশ্ব থেকেই নয়, মুসলিম বিশ্ব থেকে পৃথক হয়ে গেছে।
আদর্শ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ইখতিলাত। অপরিচিত ও ইসলামের দৃষ্টিতে অননুমোদিত নারী-পুরুষের মেলামেশা নিষিদ্ধ বিষয় সৌদিতে। রাজতন্ত্রের আইন বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে বলেন, এতে অশ্লীলতা, বিবাহ বিচ্ছেদ, অবিবাহিত নারী-পুরুষের সন্তান হওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেবে।
এসব নিয়ম নিয়ে বহু বছর এক জায়গায় আটকে ছিলেন ঘামদি। ইসলামের পবিত্র ভূমি মক্কায় ওই কমিশনের প্রধান হলো তাকে। তিনি এসব বিধি-নিষেধ সঠিকভাবে বুঝতে কুরআনের সহায়তা নিলেন। তিনি মহানবী এবং তার কাছের মানুষদের জীবনযাপনের গল্পগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। অদ্ভুত হলেও সত্য, ইসলামের প্রথমদিকে নারী-পুরুষের মেলামেশার ওপর এমন কঠিন বিধি-নিষেধ ছিল না।
যা জানলেন তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন লেখালেখিতে, টিভিসহ বিভিন্ন মিডিয়ায়। তিনি বলেন, নামাজের জন্য দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। নবীজীর সময় নারীরা উটের পিঠে চড়ে চলাফেরা করতেন। তা এখনকার নারীদের বিমান চালনার থেকে পৃথক কিছু নয়। কিন্তু এ নিয়ে নানা বিধি-নিষেধের কথা তোলা হয়।
নারীদের গোটা দেহ পর্দায় ঢাকার কথা বলা হয়েছে। এমনকি মুখমণ্ডলও ঢাকতে বলা হয়। কিন্তু নারীরা মুখ কেবল নিজেরা চাইলে ঢাকতে পারেন। ঘামদি নিজের স্ত্রীকে নিয়ে টেলিভিশনে ক্যামেরার মুখোমুখি হয়েছেন। তার স্ত্রীর মুখ খোলা ছিল এবং সেখানে মেকআপও ছিল।
তার এমন বক্তব্য রাজতন্ত্রের ইসলামি বিধি-নিষেধ প্রয়োগকারীদের মধ্যে বোমা ফেললো। নিয়ন্ত্রক শেখদের প্রতিষ্ঠিত নিয়মের ভুল সম্পর্কে স্পষ্ট জানান দিচ্ছেন তিনি। এমন প্রচলিত নিয়ম ইসলাম এবং জীবন সম্পর্কে মানুষকে ভুল ধারণা দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
তার সহকর্মীরা অফিসে তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার মোবাইলে ক্ষোভে ফেটে পড়া কোনো ব্যক্তির হুমকি আসতে শুরু করেছে। টুইটারে অজ্ঞাতনামে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতাবাদ শেখরা মনে করছেন, তার শাস্তি হওয়া দরকার।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বেন হাবার্ড এ প্রতিবেদনের কাজে সৌদি আরব যান। সেখানে তিনি ‘ওয়াহাবিজম’ সম্পর্কে জানতে চান। বলা হয়ে থাকে, সৌদি সুন্নীদের এই দারুণ রক্ষণশীল ধারণা গোটা বিশ্বে মুসলিম জাহানের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্যে দায়ী। এ ধারণাই সন্ত্রাসবাদকে পরিচর্যা করছে। সৌদির শেখ, ইমাম, ধর্ম বিশেষজ্ঞ এবং বহু স্তরের মানুষের সঙ্গে মিশেছেন প্রতিবেদক।
ধর্ম এখানকার প্রতিদিনের জীবনের একমাত্র অবলম্বন। ব্যাংকের কর্মী থেকে শুরু করে আলেমদের একটাই লক্ষ্য, শরীয়ত মোতাবেক কাজ চলছে তো? স্কুলের বইয়ে লেখা থাকে ছেলেদের কিভাবে চুল কাটতে হয় বা মেয়েদের শেখানো হয় কিভাবে দেহ ঢেকে রাখতে হয়।
ইসলাম যেখানে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থার পথ দেখায় সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, একে কিভাবে চর্চা করা হচ্ছে। সৌদিরা এক্ষেত্রে আরবের রক্ষণশীলতার আইকন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নারী-পুরুষের মেলামেশার ক্ষেত্রে।
নারীরা আবায়াস দিয়ে দেহ ঢেকে রাখেন। চুল ও মুখ ঢাকার পৃথক বস্ত্র রয়েছে। রেস্টুরেন্টে নারী-পুরুষের আলাদা বসার জায়গা থাকে। আবার পরিবারের জন্যে আলাদা স্থান। সেখানে কেবল নারী-পুরুষ একসঙ্গে বসতে পারবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ অতি সামান্য সময়ের জন্য হোটেলের লবিতে দেখা করেন। এমনও হয়, রক্ষণশীল পুরুষরা তার সারা জীবন কাটিয়েছেন কোনো নারীর চেহারা না দেখে। এমনকি তারা তাদের ভাইয়ের স্ত্রীদেরও চেনেন না।
সৌদিদের কাছে তাদের দেশ মুসলিমদের জন্যে এক অনন্য রাষ্ট্রব্যবস্থার নমুনা। তাদের নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সে দেশের সাধারণ মুসলমানরা রাজতন্ত্রের এমন রক্ষণশীল নিয়মে বেশ বিপাকে আছেন। তারা এমন ইসলাম চান যা বাহুল্যবর্জিত। কিন্তু মডারেট ইসলাম অনুসরণ করে সৌদিরা- এমনটাই দাবি তাদের। কিন্তু রাজতন্ত্রের মডারেট ইসলাম জনসমক্ষে অপরাধীদের শিরশ্ছেদ করে, ধর্মত্যাগীদের শাস্তি দেয় এবং পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নারীদের ভ্রমণে বাধা দেয়।
তারা জিহাদকে উৎসাহিত করে না। তারা দেশের নিয়ম-কানুনের প্রতি সবাইকে মান্য করতে বলে। তবে সৌদির রাজ পরিবার এই জিহাদের বিষয়টি নিয়ে সব সময় ভীত। জিহাদিদের উত্থান হয়তো তাদের ঘরে ঘরে আগুন জ্বেলে দেবে।
বহু গবেষক জানান, ওয়াহাবিজম বলতে আসলে কিছু নেই। প্রতিবেদককে বিশেষজ্ঞ হিশাম আল শেখ বলেন, ওয়াহাবিজমের কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরোটাই খাঁটি ইসলাম। ১৮ শো শতকে শেখ মোহামেদ ইবনে আবদুল-ওয়াহাব ধর্ম সংস্কারের ডাক দেন। সেখান থেকে ক্রমেই তার মতবাদকে খাঁটি ইসলাম বলে মনে করা হতে থাকে। বহু ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে ওয়াহাবিজম প্রতিষ্ঠিতি পেয়েছে মানুষের মতে।
আসলে সৌদি রাজতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া ধর্মীয় নিয়ম-কানুনে এলোমেলো আমলতন্ত্রে বিশুদ্ধতা আনার লক্ষ্য থেকেই ওয়াহাবিজমের জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্ম শিক্ষায় শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটরা বের হওয়া শুরু করলেন। বিচারকরা শরীয়াহ নিয়মে বিচার করেন। শীর্ষস্থাণীয় আলেমদের পরামর্শে রাজা অফিস-আদালতে কড়া ধর্মীয় নিয়ম চালু করতে থাকলেন। ফতোয়া দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হলো। মসজিদের ইমামদের এ সংক্রান্ত দায়িত্ব দেওয়া হলো। পাঁচ ওয়াক্তের আযানের মাধ্যে সৌদিরা সাধারণত দিনের সময়ের হিসাবটি বুঝে নেন।
ইসলাম নিয়ে অনেকের ধারণা অনেক পরিষ্কা। বহু বিশেষজ্ঞের মতে, ইসলাম এতটা রক্ষণশীল নয় যা সৌদিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এমনই এক বিশেষজ্ঞ জানান, ইসলাম অমুসলিমদের সঙ্গে ব্যবসা নিষিদ্ধ করেনি। ইসলামের নামে চরম যে ঘটনার নমুনা আমরা দেখি, তা ইসলামে নেই। নিয়ম পালনে এসব ঘটনার বিরোধিতা করেন তিনি।
জন্মদিন পালনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে রাজ পরিবারের আলেমদের। তাই তাদের ছেলে-মেয়েরা জন্মদিনের পার্টিতে যেতে পারেন না। অবশ্য বাসার ভেতরেই তারা তা পালন করেন।
রেস্টুরেন্টে ব্যাকগ্রাউন্ড সঙ্গীত নিয়ে তার কোনো আপত্তি নেই। তবে মাতলামির মাধ্যমে অশ্লীল সঙ্গীত মেনে নেওয়া যায় না বলেই মনে করেন তিনি।
সৌদির সাধারণ মানুষের জীবন ধর্মীয় অনুশাসনে পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে তাদের কাছে সেলিব্রিটি হয়ে আছেন শেখরা। তাদের চলাফেরা, মন্তব্য এবং চিন্তাধারা অনুস্মরণীয় হয়ে ওঠে মানুষের কাছে। তবে এখন পুরনো আমলের শেখ এবং আধুনিক শেখরা রয়েছে। পুরনোরা চরমভাবাপন্ন। আর নতুনরা সহনীয় ইসলাম চর্চায় আগ্রহী। তাদের জীবনযাপন ফতোয়ায় ভরপুর। হারাম আর হালাল দ্বারা পরিচালিত তারা। এক আলেম একবার কার্টুন চরিত্র মিকি মাউসের মৃত্যু চাইলেন। পরে অবশ্য তার ফতোয়া থেকে সরে এসেছেন। অন্য একজন ‘অল-ইউ-ক্যান-ইট’ ব্যুফেকে হারাম ঘোষণা করলেন।
৫১ বছর বয়সী ঘামদি এখন ধর্মীয় পুলিশ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, শেখদের এই দুনিয়ায় হাজারো ফতোয়া এবং অতিমাত্রায় বিবেচনাপূর্ণ নিয়মে তার জীবন পরিচালিত হয়েছে। তিনি ভাবতেন এক সময় ধর্ম সংস্কারক হবেন। অর্থাৎ আসল ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবেন। গ্র্যাজুয়েশনের পর তিনি ধর্মশিক্ষা নিয়েছেন। অমুসলিম দেশগুলোতে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি। জানান, ওই সময় আলেমরা ফতোয়া দিলেন, খুব জরুরি ছাড়া অমুসলিম দেশে ভ্রমণ করা নিষেধ। এক সময় একটি স্কুলে অর্থনীতি পড়াতেন। কিন্তু ছেড়ে দিলেন। কারণ সেখানে কেবল পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র পড়ানো হতো। সেখানে তিনি বাড়তি ইসলামিক ফিনান্স যোগ করলেন। বাড়তি পড়তে আপত্তি জানালো শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় নিয়ত পালনে অমানবিক পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটে। এতে ধর্মের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে মানুষ।
২০০৫ সালে কমিশন ফর মক্কার প্রধান মৃত্যুবরণ করলে ঘামদি সেই স্থানে বসেন। এটা বড় একটা চাকরি। ইসলামের পবিত্র ভূমিতে ইসলামিক নিয়ম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব তার। সেখানেই বুঝতে পারলেন, কমিশনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভুল ধারণায় পরিচালিত। ব্যক্তিগতভাবে তিনি হালাল-হারাম বুঝতে মহানবীর জীবনাচরণকে পুঁজি করেছেন। বলেন, বড় বড় আলেমরা এটা হারাম ওটা হারাম বলে যান। অথচ তারা একটারও প্রমাণ দাঁড় করাতে পারবেন না।
ঘামদির জন্যে দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশে সঠিক ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যা করতে চান তাতে বাধা দেন আলেম সমাজ। এ বিষয়ে ২০০৯ সালে দুটো বিশাল নিবন্ধ লিখছেন তিনি।
সেখানে এসব নিয়ে বলার সুযোগ নেই। অনেকেই প্রচলিত নিয়মের ভুলগুলো বোঝেন। বিরোধী মত সম্পর্কে শেখানোর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। জেদ্দার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং তার স্ত্রী তেমনটাই মনে করেন। এ নিয়ে লড়াই করলেও চরম সীমাবদ্ধতার মাঝে করতে হবে।
ঘামদির অবস্থা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন অসংখ্য সৌদ। এ দলে রাজপরিবারের সদস্যসহ অনেক আলেমরাও আছেন। এ কারণেই হয়তো হাসপাতাল, কনফারেন্স বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষ মুখোমুখি অনেক স্থানে দেখা যায়। তবুও সমাজে রক্ষণশীলদের শক্ত ভাগ রয়েছে। তারা রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠিত খাঁটি ইসলামিক সমাজের পরিচয় ধরে রাখতে চান।
তবে এ বছরের এপ্রিলে সবাইকে অবার করে দিয়ে ধর্মীয় পুলিশের ওপর নতুন এক ডিক্রি জারি হলো। সাধারণ মানুষকে আটকের ক্ষেত্রে তাদের আরো নমনীয় হতে বলা হয়। এ আদেশকে সাধুবাদ জানান ঘামদি।
বর্তমানে মানুষ থেকে একটু দূরে দূরেই থাকেন তিনি। কারণ সবই তাকে বেশ অপমান করার চেষ্টা করেন। তার চিন্তাধারা বা লেখালেখির বিরোধিতা করেন অনেকে।
প্রতিবেদকের সঙ্গে শেষ আলাপচারিতা হয় ঘামদির স্ত্রী জাওয়াহিরের সঙ্গে। বলেন, আমরা এই বার্তা দিয়েছি নাম কামাতে নয়। আমরা বিখ্যাত হতে চাই না। আমাদের এই বার্তা সেই সমাজের প্রতি যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা চলে। সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস
bdnews64 বাংলাভাষায় প্রকাশিত দেশের সর্ববৃহৎ সংবাদ পোর্টাল